বিজয় সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রে তদন্ত, সাংবাদিকও জিজ্ঞাসাবাদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৭ বার
বিজয় সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রে তদন্ত, সাংবাদিকও জিজ্ঞাসাবাদ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপাতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন সরকারকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগে আলোচিত একটি ষড়যন্ত্রের তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। চেন্নাই পুলিশের বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) জানিয়েছে, সরকার উৎখাতের অভিযোগে ইতোমধ্যে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে একজন জ্যেষ্ঠ টেলিভিশন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে। এদিকে তদন্তে বিরোধী রাজনৈতিক দল ডিএমকের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। যদিও ডিএমকে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি থালাপাতি বিজয় নামে পরিচিত, চলতি বছরের ১০ মে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার নেতৃত্বাধীন তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) বিধানসভা নির্বাচনে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দলের সমর্থনে ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় জোট সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা সামনে আসে বলে অভিযোগ।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, কথিত এই পরিকল্পনার সাংকেতিক নাম ছিল ‘প্রজেক্ট মেঘালয়া’। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল টিভিকের অন্তত ১৫ জন বিধায়ককে বিপুল অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে দলত্যাগে উৎসাহিত করা। সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার পরিবর্তে প্রথমে বিধানসভার স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং পরে একযোগে কয়েকজন বিধায়কের পদত্যাগের মাধ্যমে সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে বঞ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন।

এই ঘটনার সূত্রপাত হয় জুন মাসের শেষ দিকে। পুলিশ জানিয়েছে, উথানগারাই কেন্দ্রের টিভিকে বিধায়ক এন. ইলাইয়ারাজার সঙ্গে যোগাযোগ করেন সমীক্ষা পরামর্শক ও ইউটিউবার তিরুনাভুক্কারাসু। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভোট দেওয়ার বিনিময়ে ৩৫ কোটি রুপি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিধায়ক সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ২৯ জুন বিধায়ক ইলাইয়ারাজা চেন্নাই পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে বিশেষ তদন্ত দল। অভিযান চালিয়ে তিরুনাভুক্কারাসুসহ মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন, চ্যাট হিস্ট্রি ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, মূল অভিযুক্ত তিরুনাভুক্কারাসুর সঙ্গে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিজয়নের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ তাকে দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তার মোবাইল ফোন জব্দ করে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি কিংবা তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি।

এই ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চেন্নাই প্রেস ক্লাব পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করে এক বিবৃতিতে বলেছে, দীর্ঘ সময় ধরে একজন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার ফোন জব্দ করার ঘটনায় যথাযথ আইনি ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। তাদের অভিযোগ, এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে চেন্নাই পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে এবং প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে অতিরিক্ত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পুলিশ।

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে তামিলনাড়ুর সাবেক মন্ত্রী এবং ডিএমকে নেতা সেন্থিল বালাজি ও তার ভাই অশোক বালাজির নাম উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে পুলিশ। তবে এখনও তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি।

ডিএমকে নেতৃত্ব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সরকার উৎখাতের কোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাদের দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দলটির মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের নেতাদের নাম জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে থালাপাতি বিজয়ের উত্থান নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের আধিপত্য থাকা রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র করেছে। ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পারস্পরিক অভিযোগও বাড়ছে।

এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্তে যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর সত্যতা আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ বা ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নিশ্চিত করা যায় না। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

বর্তমানে বিশেষ তদন্ত দল ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে জানিয়েছে চেন্নাই পুলিশ। অন্যদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রমের দিকে নজর রাখছে দেশটির গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত