প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের কৃষিকে আরও আধুনিক, উৎপাদনশীল ও টেকসই করে গড়ে তুলতে যান্ত্রিকীকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ছাড়া ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। উৎপাদন ব্যয় কমানো, শ্রম সংকট মোকাবিলা এবং নতুন প্রজন্মকে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বুধবার রাতে নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা এলাকায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আয়োজিত যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি, কৃষি কর্মকর্তা, গবেষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনব্যবস্থার মূল ভিত্তি কৃষি। দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই কৃষিকে আরও লাভজনক, আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তর করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, কৃষি শুধু একটি পেশা নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।
তিনি বলেন, ‘ভাতে-মাছে বাঙালি’—এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে ধানের উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কৃষিজমি হ্রাসের বাস্তবতায় প্রতি একক জমি থেকে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অনুষ্ঠানে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার মেশিনের কার্যকারিতা তুলে ধরে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, এই যন্ত্রের মাধ্যমে মাত্র ৪০ সেকেন্ডে চার সারি ধানের চারা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে সময়, শ্রম এবং উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে চারা রোপণ হওয়ায় ধানের ফলন বাড়ারও সম্ভাবনা তৈরি হয়। তিনি বলেন, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার কৃষিতে এক ধরনের নীরব বিপ্লবের সূচনা করেছে এবং আগামী দিনে এটি দেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক শিক্ষিত তরুণ কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কৃষিকে এখনও অনেকে কেবল কায়িক শ্রমনির্ভর পেশা হিসেবে দেখেন। এই ধারণা বদলাতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষি নতুন প্রজন্মের কাছে একটি সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি এবং গবেষণাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষি খাতে আরও বেশি সম্পৃক্ত হবেন।
তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কৃষির আধুনিকীকরণ ও যান্ত্রিক বিপ্লবকে জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে শুধু খাদ্য উৎপাদনই নয়, কৃষকের জীবনমানও উন্নত করা সম্ভব হবে। সরকারের লক্ষ্য কৃষিকে একটি লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ খাতে পরিণত করা।
বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কৃষি উন্নয়নে অবদানের কথাও স্মরণ করেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এখন কৃষিকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তোলার সময় এসেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে চায়, যেখানে বিদেশ থেকে চাল আমদানির প্রয়োজন হবে না। বরং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চাল রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এজন্য গবেষণা, উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবন, যান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকার কৃষক কল্যাণমূলক কর্মসূচির বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষি সহায়তা কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত ভূমিহীন, দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তা করা। তাই কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি বরদাশত করা হবে না।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে বলেন, কোনো অবস্থাতেই সচ্ছল ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলের আত্মীয়-স্বজনদের নামে কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা যাবে না। এমন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি সুবিধা অবশ্যই প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে পৌঁছাতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কৃষকরা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপণের কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে পারেন। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে যান্ত্রিক কৃষির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকরা কম সময়ে বেশি জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবনের পাশাপাশি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। কৃষকদের হাতে নতুন প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী এবং মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস, শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। গবেষণা, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয়ে কৃষিকে আধুনিক রূপ দিতে পারলে শুধু খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরকারের ঘোষিত কৃষি আধুনিকীকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের আয় বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং কৃষকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিই হতে পারে ভবিষ্যতের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি।