গ্রিন ইয়ার্ড বাড়লেও থামছে না জাহাজভাঙা দুর্ঘটনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
গ্রিন ইয়ার্ড বাড়লেও থামছে না জাহাজভাঙা দুর্ঘটনা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পরিচিত। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের কারণে এই শিল্প দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে ‘গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ড’ গড়ে তুলতে উদ্যোক্তারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র এখনও উদ্বেগজনক। কারণ বিপুল বিনিয়োগের পরও কমেনি দুর্ঘটনা, থামেনি শ্রমিকের প্রাণহানি।

সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের কার্যক্রম শুরু হয়। পরিবেশ সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে জাহাজ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে হংকং কনভেনশনে বাংলাদেশের অনুসমর্থন কার্যকর হওয়ার পর গ্রিন ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার গতি আরও বাড়ে। বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানদণ্ড পূরণ করে গ্রিন সনদপ্রাপ্ত জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে।

জাহাজভাঙা শিল্প সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, একটি গ্রিন ইয়ার্ড গড়ে তুলতে আকারভেদে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। গত ছয় বছরে গ্রিন সনদপ্রাপ্ত বিভিন্ন ইয়ার্ডে অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিরাপদ মেঝে নির্মাণ এবং শ্রমিক নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নে অন্তত দুই হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। এসব বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিল্পকে উন্নীত করা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো।

সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের উত্তর সলিমপুরে এনবি স্টিল এবং দক্ষিণ শীতলপুরে আরব শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং লিমিটেড গ্রিন সনদ অর্জন করেছে। আরব শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান নুর উদ্দিন রুবেল জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে তাঁদের প্রতিষ্ঠান শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই প্রায় ৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তুলতে এ ধরনের বিনিয়োগ অপরিহার্য।

তবে বাস্তবতা হলো, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শ্রমিক নিরাপত্তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে ২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তিনজন শ্রমিক নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।

বিলসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ভারী গার্ডার বা ধাতব কাঠামো ওপর থেকে পড়ে যাওয়া, ক্রেনের হুক খুলে যাওয়া, গ্যাস বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দায়ী। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন কাটারম্যান, ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ, ফিটারম্যান এবং লোডিং গ্রুপে কর্মরত শ্রমিকরা। তাদের অনেকেই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সব সময় পান না।

শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, শুধু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নিরাপদ কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কঠোর তদারকি এবং নিরাপত্তা নীতিমালা বাস্তবায়ন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকা, নিরাপত্তা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা এবং তদারকির ঘাটতির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে।

জাহাজভাঙা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। গত দেড় দশকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের বিভিন্ন জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে দুই শতাধিক দুর্ঘটনায় শতাধিক শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। শুধু ২০২৩ সালে ৩৪টি দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত এবং ২৮ জন আহত হন। ২০২৪ সালে ২৮টি দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু ও ৩৬ জন আহত হন। ২০২৫ সালে ৪৮টি দুর্ঘটনায় চারজন শ্রমিক নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। এর আগে ২০২০ সালে ১০ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৭ সালে ১৮ জন এবং ২০১৬ সালে ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে উদ্যোক্তারা উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করলেও নিরাপত্তা সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। শুধু যন্ত্রপাতি আধুনিক করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি শ্রমিককে নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন ও আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প খাত। তাই শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশগত মানদণ্ডের পাশাপাশি শ্রমিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরাও এখন নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্পে বিপুল বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কারণ দক্ষ ও নিরাপদ শ্রমশক্তিই একটি শিল্পের সবচেয়ে বড় সম্পদ। শ্রমিকের প্রাণহানি বা গুরুতর দুর্ঘটনা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, এটি উৎপাদন ব্যাহত করে, শিল্পের সুনাম ক্ষুণ্ন করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

জাহাজভাঙা শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে সেই অগ্রযাত্রাকে অর্থবহ করতে হলে আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কঠোর নিরাপত্তা তদারকি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও শ্রমিকের প্রাণ রক্ষা এবং দুর্ঘটনা কমানোর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত