প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালিয়ে মো. আরিফুল ইসলাম (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-১২। অভিযানে তার কাছ থেকে অনলাইন জুয়া পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, দুটি স্মার্টফোন, চারটি সিমকার্ড এবং নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে। র্যাবের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মের এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে নতুন ব্যবহারকারী সংগ্রহের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বিস্তারে ভূমিকা রাখতেন।
বুধবার (২২ জুলাই) দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। র্যাব-১২-এর সদস্যরা ওই এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরিফুল ইসলামকে আটক করেন। অভিযান চলাকালে তার শয়নকক্ষ তল্লাশি করে অনলাইন জুয়া পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ও অন্যান্য আলামত উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-১২, সিপিসি-৩, মেহেরপুর ক্যাম্পের কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত সরকার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে গোপনে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগের ভিত্তিতেই এ অভিযান পরিচালিত হয়। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করার পর পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, আরিফুল ইসলাম বিভিন্ন অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ‘ওয়ান এক্স বেট’, ‘ওয়ান এক্স পার্টনারস’ এবং ‘মেইলবেট’-এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকদের যুক্ত করতেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় অফার, কমিশন এবং রেফারেল লিংকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়ায় অংশ নিতে উৎসাহিত করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, দুটি স্মার্টফোন, চারটি সিমকার্ড এবং নগদ এক হাজার ৯৭০ টাকা জব্দ করা হয়। উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল ডিভাইসগুলোতে অনলাইন জুয়া পরিচালনার বিভিন্ন তথ্য, লেনদেনের রেকর্ড এবং যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হতে পারে।
র্যাব জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
ঘটনার পর গাংনী থানায় জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬-এর ১৬, ১৭, ১৯(১) ও ২৫ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত সম্ভাব্য অন্য ব্যক্তি, আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের সুযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন, রেফারেল বোনাস এবং দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতিই নয়, সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতাও তৈরি হচ্ছে।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়া এখন কেবল একটি বিনোদনমূলক ঝুঁকি নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে অর্থপাচার, প্রতারণা এবং সংগঠিত সাইবার অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠছে। ফলে এ ধরনের অপরাধ দমনে শুধু অভিযান নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
র্যাব জানিয়েছে, অনলাইন জুয়াসহ প্রযুক্তিনির্ভর সব ধরনের অপরাধ দমনে তাদের গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে তথ্যভিত্তিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়ার প্রলোভনে পা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাহিনী। সন্দেহজনক অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য থাকলে তা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোরও অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অর্থ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।