সর্বশেষ :

৩০০ কোটি আয় করেও কেন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ ‘ভূত বাংলা’?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
৩০০ কোটি আয় করেও কেন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ ‘ভূত বাংলা’?

প্রকাশ:  ২৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অক্ষয় কুমার ও প্রিয়দর্শনের জুটি বলিউডে দীর্ঘদিন ধরেই সফল কমেডি চলচ্চিত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ‘হেরা ফেরি’, ‘গরম মাসালা’, ‘ভাগম ভাগ’ এবং ‘ভুলভুলাইয়া’র মতো একাধিক জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়ে এই জুটি দর্শকদের মনে আলাদা স্থান করে নিয়েছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভুলভুলাইয়া’ হরর-কমেডি ঘরানায় নতুন এক মানদণ্ড তৈরি করেছিল। সেই স্মৃতিকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালে মুক্তি পায় তাঁদের নতুন সিনেমা ‘ভূত বাংলা’। মুক্তির আগেই ছবিটি ঘিরে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কারণ, প্রায় দেড় দশক পর আবারও একসঙ্গে কাজ করেছেন অক্ষয় কুমার ও প্রিয়দর্শন।

চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ‘ভূত বাংলা’ নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ১২০ কোটি রুপি। আন্তর্জাতিক বাজারসহ বিশ্বব্যাপী সিনেমাটি ২৪০ কোটিরও বেশি রুপি, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৭ কোটি টাকার ব্যবসা করে। বক্স অফিসে এটি ‘সেমি হিট’ হিসেবে বিবেচিত হলেও সমালোচকদের মতে, দর্শকদের প্রত্যাশার উচ্চতায় পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি ছবিটি। পরে ১২ জুন নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর বাংলাদেশেও সিনেমাটি দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয় কনটেন্টের তালিকায় অবস্থান ধরে রাখে।

‘ভূত বাংলা’র গল্প আবর্তিত হয়েছে রহস্যময় মঙ্গলপুর গ্রামকে ঘিরে। বহু বছর ধরে সেখানে কোনো বিয়ে হয় না। স্থানীয়দের বিশ্বাস, ‘বধূসুর’ নামে এক অতিপ্রাকৃত শক্তি বিয়ের রাতেই নববধূদের অপহরণ করে। লন্ডনপ্রবাসী অর্জুন ও তার বোন মীরা পারিবারিক সম্পত্তির সূত্র ধরে মঙ্গলপুরের একটি পুরোনো প্রাসাদে আসেন। বোনের বিয়ে সেই প্রাসাদেই আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক রহস্যময় ঘটনার মুখোমুখি হন তাঁরা। ধীরে ধীরে সামনে আসে বহু বছরের গোপন ইতিহাস এবং অতীতের অন্ধকার রহস্য।

সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল এর তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী। অক্ষয় কুমারের পাশাপাশি টাবু, ওয়ামিকা গাব্বি, মিথিলা পালকার, যীশু সেনগুপ্ত, পরেশ রাওয়াল, রাজপাল যাদব এবং প্রয়াত আসরানির উপস্থিতি ছবিটিকে সমৃদ্ধ করেছে। অক্ষয় তাঁর পরিচিত কমেডি ঘরানার অভিনয় দিয়ে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রাজপাল যাদব ও পরেশ রাওয়ালের অভিনয়ও দর্শকদের হাসির খোরাক জুগিয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, শক্তিশালী অভিনেতাদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে তাঁদের অভিনয় যথাযথভাবে ফুটে ওঠেনি।

বিশেষ করে টাবুর মতো শক্তিশালী অভিনেত্রীকে খুব সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। যীশু সেনগুপ্ত নিজের চরিত্রে আন্তরিক থাকলেও তাঁর চরিত্র নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মিথিলা পালকার ও ওয়ামিকা গাব্বির চরিত্রও আরও গভীরভাবে উপস্থাপন করা যেত বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা। তবে অল্প সময়ের উপস্থিতিতেই প্রয়াত আসরানি দর্শকদের মনে আলাদা ছাপ রেখে যেতে সক্ষম হয়েছেন।

ছবিটির প্রথমার্ধে রহস্য, ভৌতিক পরিবেশ এবং হালকা কমেডির সমন্বয় দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখে। কিন্তু বিরতির পর গল্পের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অতিপ্রাকৃত শক্তির ব্যাখ্যা, দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাক এবং পৌরাণিক উপাদানের আধিক্য মূল কাহিনিকে জটিল করে তোলে। অনেক নতুন তথ্য যোগ হলেও সেগুলোর সঙ্গে মূল গল্পের সংযোগ সব সময় স্পষ্ট হয় না। ফলে রহস্য তৈরির পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলেই মত সমালোচকদের।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এর দীর্ঘ সময়কাল। প্রায় তিন ঘণ্টার কাছাকাছি দৈর্ঘ্যের কারণে গল্পের গতি বারবার থেমে গেছে। বেশ কিছু দৃশ্য সংক্ষিপ্ত করা হলে সিনেমাটি আরও প্রাণবন্ত হতে পারত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে শেষ অংশে ব্যবহৃত কম্পিউটার গ্রাফিক্স বা সিজিআইও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রাসাদের ভৌতিক পরিবেশ যতটা যত্ন নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, ক্লাইম্যাক্সের ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট সেই মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘ভূত বাংলা’র সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘ভুলভুলাইয়া’র সঙ্গে তুলনা। দর্শকদের মনে অক্ষয়-প্রিয়দর্শন জুটির আগের সাফল্যের স্মৃতি এতটাই গভীর যে নতুন ছবিটির প্রতি প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু শক্তিশালী চিত্রনাট্য, নতুনত্ব এবং ধারাবাহিকতার অভাবে ছবিটি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। অনেকেই মনে করছেন, সিনেমাটি একই সঙ্গে কমেডি, হরর, পৌরাণিক ফ্যান্টাসি এবং অ্যাডভেঞ্চারের মিশ্রণ হতে গিয়ে কোনো ধারাতেই পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।

তবে বাণিজ্যিক দিক থেকে ‘ভূত বাংলা’ একেবারেই ব্যর্থ নয়। প্রেক্ষাগৃহে উল্লেখযোগ্য আয় করার পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও এটি ভালো দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় কনটেন্টের তালিকায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে সিনেমাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। অক্ষয় কুমার ও প্রিয়দর্শনের দীর্ঘদিনের ভক্তদের জন্য ছবিটি নস্টালজিয়ার অনুভূতি ফিরিয়ে আনলেও নতুন প্রজন্মের হরর-কমেডি সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এটি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে বলেই সামগ্রিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে ‘ভূত বাংলা’ একটি বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকদের নিরাশ না করলেও, অক্ষয় কুমার ও প্রিয়দর্শনের অতীতের কালজয়ী কাজের সঙ্গে তুলনা করলে এটি প্রত্যাশার চেয়ে কম উজ্জ্বল। শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী, আকর্ষণীয় প্রেক্ষাপট এবং বাণিজ্যিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও দুর্বল চিত্রনাট্য ও অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘতার কারণে ছবিটি সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত