প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। দীর্ঘদিন ধরে দেশের খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন ও বিক্রয় ব্যবস্থায় সমন্বিত তথ্যের অভাব থাকায় কার্যকর তদারকি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। সেই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে এবার দেশের ১০ লাখ ১৩ হাজারের বেশি খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সব ধরনের খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত ডাটাবেজের আওতায় আনা গেলে খাদ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত তদারকির ক্ষেত্রেও এই তথ্যভাণ্ডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, দেশে খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কোনো জাতীয় তালিকা এতদিন ছিল না। ফলে কোথায় কত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারা কী ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করছে কিংবা কোন খাতে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া সম্ভব হতো না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই জাতীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য দেশের প্রতিটি সক্রিয় খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনা। এই তথ্যভাণ্ডার ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং তদারকি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি)-এর সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির আওতায় সারাদেশে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রশিক্ষিত তথ্যসংগ্রাহক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তারা মাঠপর্যায়ে গিয়ে খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় এক মাস আগে এই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকেরা সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে মালিকের নাম, প্রতিষ্ঠানের ধরন, ট্রেড লাইসেন্সের অবস্থা, ব্যবসার প্রকৃতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন। পরে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট জেলার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা তথ্যগুলো যাচাই করবেন। যাচাই শেষে বিএফএসএর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের আওতায় তৈরি হওয়া কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য ব্যবসা খাতের একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি হবে।
জানা গেছে, সংগৃহীত তথ্য ৩২টি প্রধান শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হবে। এর মধ্যে থাকবে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, দুগ্ধ ও মাংসজাত পণ্যের ব্যবসা, সুপারশপ, মুদি দোকান, পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্য ব্যবসা। এতে দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর সম্পর্কে একটি সমন্বিত ধারণা পাওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তথ্যের অভাবের কারণে কার্যকর নজরদারি অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি। কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, কোন খাতে বেশি ঝুঁকি রয়েছে কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদারকি করতে হবে—এসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্যের অভাব ছিল অন্যতম বড় সমস্যা। নতুন তথ্যভাণ্ডার সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর করতে পারে।
তবে এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের তদারকি বর্তমান জনবল দিয়ে সম্ভব হবে কি না—এমন প্রশ্নও উঠেছে। এ বিষয়ে মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু জাতীয় তথ্যভাণ্ডার ও আধুনিক সফটওয়্যারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সেই সক্ষমতা তৈরির প্রথম ধাপ। ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে জনবল বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি অংশ এই উদ্যোগ নিয়ে কিছু প্রশ্নও তুলেছে। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ইতোমধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করছে। ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট, টিআইএন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন ডাটাবেজে বিপুল তথ্য বিদ্যমান। সে ক্ষেত্রে নতুন করে আলাদা তথ্যভাণ্ডার তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান তথ্যসমূহ সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হলে সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার রেস্তোরাঁর তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য আধুনিকায়ন করে যদি ভ্যাট, টিআইএন এবং এনবিআরের ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে ধাপে ধাপে আরও সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে একই প্রতিষ্ঠানের তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজনও কমে আসবে।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান মনে করেন, দেশের খাদ্য খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর তদারকির বিকল্প নেই। অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকগুলোই কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তবে নতুন এই উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, তথ্যভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু হলে জবাবদিহি বাড়বে, অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা যাবে এবং ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পথ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নির্ধারিত মান বজায় রাখতে আরও দায়িত্বশীল হবে বলে তিনি মনে করেন।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না, সেই তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখা, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা গেলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য আরও দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
সরকারের নতুন এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের খাদ্য ব্যবসা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল, মানহীন উৎপাদন এবং অনিয়ম প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এর চূড়ান্ত সুফল পাবেন দেশের কোটি কোটি ভোক্তা, যারা প্রতিদিন নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যের প্রত্যাশা করেন।