প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। তিনি বলেছেন, জাপান শুধু বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগীই নয়, বরং দেশের দুঃসময়ের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত বন্ধু। স্বাধীনতার পর থেকে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগে জাপানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রাকে গতিশীল করেছে।
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘জাপান-বাংলাদেশ বিজনেস উইমেন কনফারেন্স’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে দুই দেশের কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আয়োজকদের মতে, এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা।
মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন সংকটময় সময়ে জাপান বাংলাদেশের পাশে থেকেছে এবং উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের বিকল্প নেই। সেই বিবেচনায় জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে জাপানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ তুলে পর্যটনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করে নারীশিক্ষা বিস্তারে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তার মতে, সেই উদ্যোগ দেশের নারীশিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
আফরোজা খানম আরও বলেন, সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারীদের জন্য ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীদের আরও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কারণ নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, আধুনিক এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে। বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়ছে এবং তারা উৎপাদন, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবাখাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব তৈরিতে সহায়ক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সম্মেলনে উপস্থিত বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)-এর প্রধান প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (জেবিসিসিআই) নেতারা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৃহৎ কর্মক্ষম জনসংখ্যা এবং উন্নয়ন সম্ভাবনা জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
অনুষ্ঠানে নারী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্য রপ্তানি এবং যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন। তারা মনে করেন, দুই দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানো গেলে নতুন নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী দেশ। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন, নগর উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের বিভিন্ন প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও জাপানি বিনিয়োগের জন্য একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জাপানের মতো উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জাপান-বাংলাদেশ বিজনেস উইমেন কনফারেন্স শুধু দুই দেশের নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন সম্ভাবনা তৈরির ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।