প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধ, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার ‘গুম নিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। নতুন এই আইনের খসড়ায় গুমের কারণে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে অথবা পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো সন্ধান না মিললে দায়ী ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি গোপন আটককেন্দ্র পরিচালনা, গুমের প্রমাণ নষ্ট করা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) জনমত গ্রহণ এবং অংশীজনদের মতামতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ‘গুম নিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়। সরকার জানিয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে আইনটি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গুমের অভিযোগ এবং এ-সংক্রান্ত বিচার ও প্রতিকারের দাবি বিবেচনায় নিয়ে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ হিসেবে এই খসড়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
খসড়া আইনে ‘গুম’-এর একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা হেফাজতে নেওয়ার পর তা অস্বীকার করেন অথবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, ভাগ্য কিংবা পরিণতি গোপন রাখেন, তাহলে সেটি গুম হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে কোনো ব্যক্তি আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে সেই ঘটনাও গুমের আওতায় আসবে।
তবে খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোনো গুম ব্যাপক, পরিকল্পিত বা সুসংগঠিতভাবে সংঘটিত হয় এবং তা আন্তর্জাতিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে সেই ধরনের অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় বিচার করা হবে। অর্থাৎ, সাধারণ গুমের ঘটনা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত গুমের ঘটনার বিচারব্যবস্থার মধ্যে একটি পার্থক্য রাখা হয়েছে।
নতুন আইনে গুমের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন তিন বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে অপরাধের মাত্রা যদি আরও গুরুতর হয়, অর্থাৎ গুম হওয়া ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে বা পাঁচ বছরের মধ্যেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া না যায়, তাহলে দায়ী ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। আইন প্রণেতাদের মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
খসড়া আইনে গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ, পরিচালনা বা ব্যবহারকেও একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি অনুমোদনহীন গোপন আটককেন্দ্র স্থাপন, পরিচালনা কিংবা ব্যবহার করে, তাহলে তার জন্য কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, গোপন আটককেন্দ্রের অভিযোগগুলো তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষাপটে এই বিধানকে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু মূল অপরাধ নয়, গুমের প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তনের বিষয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি গুমসংক্রান্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ গোপন করেন, ধ্বংস করেন অথবা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন, তাহলে তার জন্যও কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখা এবং বিচারপ্রাপ্তির সম্ভাবনা নিশ্চিত করতেই এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরা।
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়বদ্ধতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা। এতে বলা হয়েছে, কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি অধীনস্থ সদস্যদের গুম করার নির্দেশ দেন অথবা এমন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে জেনেও তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তাহলে তিনিও মূল অপরাধীর সমপরিমাণ শাস্তির আওতায় আসবেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক বিচারব্যবস্থায় এই নীতির গুরুত্ব রয়েছে এবং খসড়া আইনেও সেই নীতির প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে।
আইনে আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মতো কোনো কারণ দেখিয়ে গুমকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ, কোনো পরিস্থিতিতেই গুমকে আইনসম্মত বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রাখা হয়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের স্পষ্ট অবস্থানের দাবি জানিয়ে আসছিল।
বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে খসড়া আইনে বিশেষ সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। গুমসংক্রান্ত মামলার বিচার দায়রা জজ আদালতে পরিচালিত হবে এবং বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তা শেষ করতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত প্রয়োজন মনে করলে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় বৃদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়া অপরাধ প্রমাণিত হলে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা তার পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এতে বিচার শুধু শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আর্থিক প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও পাবে।
খসড়া আইনে ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণের প্রস্তাব করেছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তির নাম, নিখোঁজ হওয়ার তারিখ, স্থান, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং তদন্তের অগ্রগতিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যরা আইন অনুযায়ী এসব তথ্য জানার সুযোগ পাবেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা পরিবারগুলোর জন্য তথ্যপ্রাপ্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের বিরুদ্ধেও কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ এনে গুমের মামলা করেন এবং তা আদালতে প্রমাণিত হয়, তাহলে তার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনের অপব্যবহার রোধে এই ধরনের বিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রণয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, স্বাধীন তদন্ত, বিচার বিভাগের কার্যকর ভূমিকা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। একই সঙ্গে জনমত গ্রহণের পর খসড়া আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকাশিত খসড়া আইনটি এখনো চূড়ান্ত নয়। জনসাধারণ, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার পর এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার মাধ্যমে আইনটি কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, আইনটি কার্যকর হলে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি হবে।