প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। আগামী ১ আগস্ট থেকে দেশের সব ধরনের নিবন্ধিত গণপরিবহনে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ডিভাইস সংযোজন এবং সেটি সার্বক্ষণিক সচল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের পর থেকে নতুন কোনো গণপরিবহনের নিবন্ধন কিংবা বিদ্যমান যানবাহনের ফিটনেস সনদ নবায়নের ক্ষেত্রে জিপিএস সংযুক্তির প্রমাণপত্র জমা না দিলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হবে না।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রকাশিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, গণপরিবহনের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ করা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক, চালক এবং অপারেটরদের দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে বিআরটিএ।
বিআরটিএর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গত ১১ জুন এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেই প্রজ্ঞাপনের আলোকে আগামী ১ আগস্ট থেকে দেশের সব গণপরিবহনে নির্ধারিত মানসম্পন্ন জিপিএস ডিভাইস স্থাপন বাধ্যতামূলক হবে। শুধু ডিভাইস সংযুক্ত করলেই হবে না, সেটি কার্যকর অবস্থায় রয়েছে কি না, তাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরিবহন নতুন করে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলে অথবা বিদ্যমান কোনো যানবাহনের ফিটনেস সনদ নবায়নের আবেদন করলে তাকে জিপিএস ডিভাইস সংযোজনের প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডিভাইসটি সক্রিয় রয়েছে এবং সঠিকভাবে অবস্থান শনাক্ত করছে—এমন কার্যকারিতাও প্রদর্শন করতে হবে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে ডিভাইস সংযুক্ত দেখালেই হবে না, বাস্তবেও সেটি সচল থাকতে হবে।
বিআরটিএ জানিয়েছে, জিপিএস ডিভাইসের নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড বা স্পেসিফিকেশন সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে পাওয়া যাবে। পরিবহন মালিকদের সেই মানদণ্ড অনুসরণ করে অনুমোদিত ডিভাইস স্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত জটিলতা বা নিবন্ধন-সংক্রান্ত সমস্যা এড়ানো সম্ভব হবে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ২৫ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৫৫ অনুযায়ী জিপিএস সংযুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পরই নতুন রেজিস্ট্রেশন অথবা ফিটনেস সনদ দেওয়া কিংবা নবায়ন করা হবে। অর্থাৎ জিপিএস ছাড়া কোনো গণপরিবহন এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সেবা পাবে না।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপরিবহনে জিপিএস বাধ্যতামূলক করা হলে যানবাহনের অবস্থান, গতি, নির্ধারিত রুট অনুসরণ এবং যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণ অনেক সহজ হবে। দুর্ঘটনা, অনিয়ম কিংবা নির্ধারিত রুট থেকে বিচ্যুতির মতো ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা গণপরিবহনে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যানবাহন চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো যানবাহন হারিয়ে গেলে বা অননুমোদিতভাবে চলাচল করলে তার অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এছাড়া পরিবহন কোম্পানিগুলো নিজেদের বহরের কার্যক্রম আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্মার্ট রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা, অনলাইন ফিটনেস নবায়নসহ বিভিন্ন সেবার পাশাপাশি এবার গণপরিবহনে জিপিএস বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত সেই উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা আরও বাড়বে।
তবে পরিবহন মালিকদের একটি অংশের মতে, নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত সচেতনতা এবং কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছোট পরিবহন মালিকদের জন্য জিপিএস ডিভাইস স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা সহজলভ্য করা হলে নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
বিআরটিএ পরিবহন মালিক, অপারেটর এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, নিরাপদ, আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১ আগস্ট থেকে নতুন এই বিধান কার্যকর হলে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।