সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরের ৩ বছরের কারাদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১২ বার
সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরের ৩ বছরের কারাদণ্ড

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি মামলার রায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী, যিনি এস কে সুর চৌধুরী নামেই সমধিক পরিচিত, তাঁকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সম্পদের হিসাব বিবরণী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুদকে দাখিল না করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মঙ্গলবার এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করা হয়। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-২-এর বিজ্ঞ বিচারক আয়েশা নাসরিন সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা শেষে এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। আলোচিত পি কে হালদারের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও নানা অনিয়মের সঙ্গে নাম জড়ানোর পর থেকেই ব্যাংক খাতের এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিচারিক প্রক্রিয়া দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আইনজীবীদের সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সাবেক এই ডেপুটি গভর্নরকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে যখন বিচারক রায় ঘোষণা করেন, তখন এজলাসে এক নীরব ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার পরপরই আদালত চত্বরে কঠোর পুলিশি প্রহরায় তাঁকে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে মামলাটির শুনানিতে অংশ নেওয়া কৌঁসুলি আবুল কালাম আজাদ সংবাদমাধ্যমকে রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান আবারও সুদৃঢ় হলো। আদালতের এই রাষ্ট্রে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই বার্তাটি আরও একবার স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে গত ১৫ জুলাই মামলাটির বিচারিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দুদক এবং আসামি পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে দীর্ঘ ও চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হয়। সেদিনই আদালত আজকের এই দিনে রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন। দুদকের কৌঁসুলি আদালত প্রাঙ্গণে যুক্তি তুলে ধরে দাবি করেছিলেন যে, সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং আইন অমান্য করে নির্ধারিত সময়ে সম্পত্তির হিসাব বিবরণী জমা দেননি। তাই আইনের সর্বোচ্চ বিধান অনুযায়ী তাঁকে যেন তিন বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়, সেই প্রার্থনা করা হয়েছিল। অপরদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী সরোজ কুমার হাওলাদার তাঁর মক্কেলের পক্ষে সাফাই গেয়ে আদালতে খালাস চেয়েছিলেন। তবে বিচারক উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এবং মামলা চলাকালে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ বিবেচনা করে এই সাজা প্রদান করেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন আদালত মোট সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। এস কে সুর চৌধুরী ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যান। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পরপরই দেশের আর্থিক খাত কাঁপিয়ে তোলা আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার বা পি কে হালদারের চাঞ্চল্যকর আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে। পি কে হালদারকে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে সুরক্ষা দেওয়ার নেপথ্যে এস কে সুরের সহযোগিতা ও সুবিধা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর ২০২২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন। ওই বছরের মার্চ মাসে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক কার্যালয়ে তলব করা হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।

তদন্ত প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১৪ জানুয়ারি দুদকের একটি বিশেষ এনফোর্সমেন্ট টিম রাজধানীর অভিজাত সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে এস কে সুর চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে। সেই থেকে তিনি একটানা কারাগারেই আটক রয়েছেন। মামলার দীর্ঘ নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এস কে সুরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পর দুদক তাঁর এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিবর্গ—বিশেষ করে স্ত্রী সুপর্ণা সুর চৌধুরী ও কন্যা নন্দিতা সুর চৌধুরীর স্বনামে বা বেনামে অর্জিত যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, দায়দেনা এবং আয়ের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী দাখিলের একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করেছিল। সেই নোটিশ অনুযায়ী ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তিনি নিজে স্বাক্ষর করে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ ও ফরম গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী দুদক কর্তৃক নির্ধারিত ও আইনানুগ ২১ কার্যদিবসের দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তিনি তাঁর সম্পদ বিবরণী দুদকে দাখিল করেননি। আইনি বাধ্যবাধকতা অমান্য করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই বিবরণী জমা না দেওয়ায় এস কে সুর, তাঁর স্ত্রী ও কন্যার বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক নাজমুল হুসাইন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলাটি তদন্ত করে একই বছরের ২৫ আগস্ট এস কে সুরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের আরেক উপপরিচালক মো. আহসান উদ্দিন। এরপর গত বছরের ৬ নভেম্বর আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মঙ্গলবার এই কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত