প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাদকাসক্তি আজ আমাদের জাতীয় জীবনের এক গভীর ক্ষত এবং তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় নীরব ঘাতক। সমাজ থেকে এই ভয়াবহ ব্যাধি চিরতরে দূর করতে হলে কেবল কঠোর আইন প্রয়োগ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; এর বিরুদ্ধে প্রয়োজন একটি সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন। উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মাদকবিরোধী বিশেষ সভায় যোগ দিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় এই কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমেই কেবল মাদকের ভয়াল থাবা থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে উত্তর জনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে এই মাদকবিরোধী উচ্চপর্যায়ের সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভার কাজ সফলভাবে শেষ করে বের হওয়ার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমসাময়িক বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই মন্তব্য করেন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংবাদকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশের বর্তমান মাদক পরিস্থিতির গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, শুধুমাত্র পুলিশি অভিযান, জেল বা কঠোর শাস্তির বিধান রেখে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের দমন করা দীর্ঘমেয়াদে কখনোই পুরোপুরি ফলপ্রসূ হয় না। অপরাধের মূল উৎপাটন করতে হলে পারিবারিক অনুশাসন, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প কিছু নেই বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন যে, ঠাকুরগাঁও জেলা থেকেই সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে একটি সুসংহত ও কার্যকর মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের সূচনা করা হয়েছে। এই চলমান আন্দোলনকে নিছক একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ বা সাধারণ অভিযান হিসেবে না রেখে একে একটি পরিপূর্ণ ও গণমুখী সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে হবে। সমাজের প্রতিটি কোণ থেকে যখন মাদকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদের স্বর জোরালো হবে, তখনই কেবল এর ভয়াবহ বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মাদকবিরোধী এই সামাজিক আন্দোলনের ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন যে, সরকারের একুশে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি যখন সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় এই কার্যক্রমে এগিয়ে আসবে, তখন এর সুফল নিশ্চিতভাবেই সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হবে। উঠান বৈঠক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা, যুবসমাজকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিমুখী করার মতো ইতিবাচক ভূমিকা পালনের ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার-প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে জনমত গঠন করতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম জেনেশুনে অন্ধকারের এই গলিতে পা না বাড়ায়। শিক্ষক, অভিভাবক, ইমাম ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন যে, যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি মাদকমুক্ত ও সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।
উক্ত মাদকবিরোধী বিশেষ সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক, পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, জেলা বিএনপির সভাপতি ফয়সাল আমিন, সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় ইউনিয়ন ও পৌর পরিষদের জনপ্রতিনিধি এবং জেলার বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সভার শুরুতে জেলার সার্বিক মাদক পরিস্থিতি এবং তা দমনে বিগত দিনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরেন জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। উপস্থিত সবাই মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঠাকুরগাঁও জেলাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত ও আদর্শ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী ঘোষণা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের জন্যও একটি চমৎকার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ভরসা না করে যখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক জাগরণ একসঙ্গে মিলিত হয়, তখনই যেকোনো সামাজিক অপরাধ নির্মূল করা সহজ হয়ে ওঠে। ঠাকুরগাঁও থেকে শুরু হওয়া এই সামাজিক আন্দোলন যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয় এবং এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়, তবে তা শুধু ওই অঞ্চলেই নয়, বরং গোটা দেশেই মাদকের বিরুদ্ধে এক নতুন ও শক্তিশালী প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।