প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের ঐতিহাসিক শহর বোর্দোর দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে ভয়াবহ দাবানল। শহরটির মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে আগুন পৌঁছে যাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও বড় পরিসরে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। দাবানলের ভয়াবহতার মধ্যে নতুন করে তীব্র তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফরাসি সরকার বলছে, দেশটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
ফ্রান্সের গিরোন্দে অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে চলা দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে হাজারো অগ্নিনির্বাপক কর্মী, বিমান ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। তবে শুষ্ক আবহাওয়া, উচ্চ তাপমাত্রা এবং দমকা বাতাস আগুনের বিস্তার ঠেকানোর প্রচেষ্টাকে বারবার ব্যাহত করছে। আগুনের লেলিহান শিখা এখন বোর্দোর উপকণ্ঠের দিকে অগ্রসর হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বোর্দোর মেয়র টমাস কাজেনাভে জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সব ধরনের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রশাসন প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আগাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষের জীবন রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা পর্যবেক্ষণ করতে গিরোন্দে অঞ্চলে সফর করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফ্রান্স এমন ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এটিই দেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তিনি জানান, অগ্নিনির্বাপক বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করছে এবং সরকার সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দাবানলের কারণে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রতিবেশী স্পেনেও দাবানলের কারণে এক লাখের বেশি মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে আগুন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করেছে, মঙ্গলবার থেকে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং শুষ্ক বাতাস আগুনকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে বর্তমানে যেসব এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, সেখানে নতুন করে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, দেশের দাবানলের বড় একটি অংশ মানুষের অসতর্কতার কারণে ঘটছে। তাঁর মতে, প্রতি ১০টি দাবানলের মধ্যে নয়টির পেছনেই মানুষের ভূমিকা রয়েছে। ফেলে দেওয়া জ্বলন্ত সিগারেট, অসতর্কভাবে বারবিকিউ করা কিংবা নিরাপত্তা বিধি না মেনে আগুন ব্যবহার করার মতো ঘটনাগুলো থেকেই অধিকাংশ দাবানলের সূত্রপাত হয়।
তিনি আরও জানান, সব দাবানল দুর্ঘটনাজনিত নয়। কিছু ঘটনায় ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর প্রমাণও পাওয়া গেছে। এ ধরনের অপরাধে চলতি মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১৬২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সরকারের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বোর্দোর দক্ষিণে অবস্থিত সেস্তাস শহরের মেয়র জেরোম স্তেফ পরিস্থিতিকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মাত্র দুই দিনের মধ্যে আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে রাতারাতি তাঁর শহরের প্রায় ১৭ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শুধু এই অঞ্চলে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। ধ্বংস হয়েছে অন্তত ২৪০টি বাড়িঘর। বহু বনভূমি, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সম্পূর্ণভাবে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের কারণে বন্যপ্রাণীরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যদিও অগ্নিনির্বাপক বাহিনী কিছু এলাকায় আগুনের বিস্তার ধীর করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতাসে ভেসে যাওয়া জ্বলন্ত অঙ্গার কয়েক কিলোমিটার দূরেও নতুন করে আগুনের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। বাতাসের দিক হঠাৎ পরিবর্তন হলে আগুন আবারও দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা প্রতিরক্ষামূলক ফায়ারব্রেক তৈরি করছেন। আগুনের সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে বনাঞ্চলের নির্দিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে ফাঁকা এলাকা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে আগুন সামনে এগোতে না পারে। একই সঙ্গে বিমান থেকে পানি ও অগ্নিনির্বাপক রাসায়নিক ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে ১৩ হাজার ৫৬৬টি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, তাপপ্রবাহ এবং বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত প্রবণতা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলেছে।
ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি এবং গ্রিসও চলতি গ্রীষ্মে একাধিক বড় দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো যৌথভাবে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমে সহায়তা করছে এবং বিভিন্ন দেশ একে অপরের কাছে বিশেষায়িত বিমান ও উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে দাবানল এখন আর কেবল মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় বাস্তবতা হয়ে উঠছে। তাই শুধু জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম নয়, বন ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বোর্দোর দিকে অগ্রসরমান এই দাবানল এখন শুধু একটি শহরের সংকট নয়, বরং পুরো ইউরোপের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের আরেকটি সতর্কবার্তা। প্রশাসন আশা করছে, আবহাওয়ার অনুকূল পরিবর্তন এবং অব্যাহত উদ্ধার তৎপরতার মাধ্যমে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে নতুন তাপপ্রবাহ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।