প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারত বৈশ্বিক বিমান যোগাযোগে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দেশজুড়ে নতুন করে ৪৪টি বিমানবন্দর নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় চারটি আন্তর্জাতিক মানের ‘হাব বিমানবন্দর’ গড়ে তোলা হবে, যেগুলো দেশের বিভিন্ন শহরকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোর সঙ্গে আরও দ্রুত, সহজ ও কার্যকরভাবে যুক্ত করবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোকে কেন্দ্রীয় হাবের সঙ্গে সংযুক্ত করে যাত্রীদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে আরও সহজ করে তুলতে ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেল বাস্তবায়নের উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের এই নতুন পরিকল্পনাকে দেশটির পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, আগামী এক দশকের মধ্যে ভারতের বিমান যোগাযোগকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশটি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বরং বৈশ্বিক বিমান চলাচলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার পাঞ্জাবের অমৃতসর বিমানবন্দর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেলের ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে এয়ার ইন্ডিয়া। এর আগে উত্তর প্রদেশের বারাণসী থেকে পরীক্ষামূলকভাবে একই ধরনের সেবা চালু করা হয়েছিল। অমৃতসর এখন এই ব্যবস্থার আওতায় দ্বিতীয় স্পোক বিমানবন্দর হিসেবে যুক্ত হলো।
বর্তমানে ভারতের প্রধান হাব বিমানবন্দর হিসেবে কাজ করছে রাজধানী দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখান থেকেই আন্তর্জাতিক রুটে অধিকাংশ সংযোগ পরিচালিত হয়। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে আরও তিনটি আন্তর্জাতিক হাব গড়ে তোলা হবে, যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যাত্রীরা রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে সহজে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ভ্রমণ করতে পারেন।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল সচিব সমীর কুমার সিনহা জানান, সরকার চারটি হাব বিমানবন্দর এবং আরও ৪০টি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এসব বিমানবন্দর দেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির শহরগুলোকে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। তাঁর ভাষায়, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভারতের বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
হাব অ্যান্ড স্পোক মডেল মূলত এমন একটি বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা, যেখানে একটি বড় বিমানবন্দরকে কেন্দ্র বা ‘হাব’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দেশের বিভিন্ন ছোট বা আঞ্চলিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রীরা প্রথমে ওই হাবে পৌঁছান। এরপর সেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সংযোগ ফ্লাইটে যাত্রা করেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে একই সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, যাত্রার সময় কমে এবং বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং সিঙ্গাপুরের মতো অনেক সফল বিমান পরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই এই মডেল অনুসরণ করে আসছে। ভারতও এখন সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের বিমান নেটওয়ার্ককে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে চায়।
অমৃতসর থেকে চালু হওয়া নতুন ব্যবস্থার আওতায় এয়ার ইন্ডিয়া দিল্লির মাধ্যমে ২৭টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে অমৃতসরের যাত্রীরা এখন দিল্লি হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন শহরে আরও সহজে ভ্রমণ করতে পারবেন।
এয়ার ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, অমৃতসর থেকে দিল্লি পৌঁছানোর চার ঘণ্টার মধ্যেই যাত্রীরা আন্তর্জাতিক সংযোগ ফ্লাইটে উঠতে পারবেন। এই দ্রুত সংযোগ নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে ‘ইজি কানেক্ট’ সেবা, যা যাত্রীদের ভ্রমণকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজ ও ঝামেলামুক্ত করবে।
‘ইজি কানেক্ট’ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যাত্রীরা নিজ শহরের বিমানবন্দর থেকেই পুরো আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য একবারেই চেক-ইন সম্পন্ন করতে পারবেন। একই সঙ্গে অভিবাসন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও স্থানীয় বিমানবন্দরেই শেষ করা যাবে। ফলে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর পুনরায় লাগেজ সংগ্রহ, নতুন করে চেক-ইন বা টার্মিনাল পরিবর্তনের মতো সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে না। এতে সংযোগ ফ্লাইট মিস হওয়ার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মঙ্গলবার থেকে অমৃতসর থেকে প্রতিদিন দুটি ‘ইজি কানেক্ট’ ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আহমেদাবাদ, গোয়া, কোচি এবং আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকেও একই ধরনের সেবা চালু করা হবে। এর আগে গত ২৫ জুন বারাণসী থেকে প্রথমবারের মতো এই সুবিধা চালু করা হয়েছিল, যা ইতোমধ্যে যাত্রীদের ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী কে. রামমোহন নাইডু এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেল শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি ভারতের ভবিষ্যৎ বিমান যোগাযোগের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর মতে, এই মডেল দেশের আকাশপথকে আরও প্রতিযোগিতামূলক, কার্যকর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলবে।
মন্ত্রী আরও জানান, আগামী ১০ বছরে ভারত সরকার মোট ১০০টি নতুন বিমানবন্দর এবং ২০০টি হেলিপোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিমান যোগাযোগ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে আঞ্চলিক উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, পর্যটন ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে সরকার আশা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রীর সংখ্যা গত এক দশকে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়ন এবং বিমান ভাড়ার প্রতিযোগিতামূলক হার এই প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে নতুন বিমানবন্দর ও উন্নত সংযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
এই বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে শুধু ভারতের বড় শহর নয়, ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক পর্যটন বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি কার্যক্রম সহজ করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, ভারতের এই পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ার বিমান পরিবহন খাতে নতুন প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রী আকর্ষণে ভারত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিষ্ঠিত হাবগুলোর বিকল্প হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
সব মিলিয়ে, ৪৪টি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ, চারটি আন্তর্জাতিক হাব প্রতিষ্ঠা এবং ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেলের সম্প্রসারণ ভারতের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। সরকারের আশা, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের কোটি কোটি মানুষের ভ্রমণ আরও সহজ হবে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে এবং ভারত বৈশ্বিক বিমান যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।