প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও যুদ্ধবিরতির কোনো কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের জন্য মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। হোয়াইট হাউসে নির্ধারিত এই বৈঠককে ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, যুদ্ধের এই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখা কিয়েভের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির যে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, সেটিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।
হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা, সামরিক সহায়তা, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ কৌশল এবং সম্ভাব্য শান্তি উদ্যোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে ইউক্রেনের দীর্ঘদিনের সমর্থক প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের স্মরণানুষ্ঠানেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে জেলেনস্কির।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করতে চান। জেলেনস্কির আশা, যুক্তরাষ্ট্র আগের মতোই ইউক্রেনকে রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত ও মর্যাদাপূর্ণ শান্তির পথ খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করবে।
জেলেনস্কি আরও বলেন, ইউক্রেন এমন একটি শান্তি চায়, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে নিশ্চিত করবে। তাঁর মতে, যুদ্ধের অবসান শুধু একটি যুদ্ধবিরতি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভলোদিমির জেলেনস্কির সম্পর্ক অতীতে একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময় দুই নেতার মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইউক্রেনের প্রতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থানের ইঙ্গিত দেখা গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। বিশেষ করে রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনে সরাসরি মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের নীতিতে পরিবর্তন আনে। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে তা ইউক্রেনে সরবরাহ করছে। এই নীতির লক্ষ্য ছিল মিত্র দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ইউক্রেনকে সহায়তার ব্যয় ভাগাভাগি করা। যদিও এই পরিবর্তন নিয়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিস্তর আলোচনা হয়েছে।
তবে সামরিক সহায়তার ধরন বদলালেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
বিশেষ করে স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক উভয় অবকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক এলাকায় প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও জরুরি সেবাগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। পাল্টা হামলায় ইউক্রেনও রাশিয়ার অভ্যন্তরে বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এতে উভয় পক্ষের সামরিক ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে এবং যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠক শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নয়, বরং ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বৈঠকে যদি সামরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং শান্তি আলোচনার বিষয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি হয়, তাহলে তা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম নির্ধারক বিষয়। ওয়াশিংটনের সমর্থনের মাত্রা ও ধরন পরিবর্তিত হলে ইউরোপীয় মিত্রদের কৌশলেও তার প্রভাব পড়ে। ফলে জেলেনস্কির এই সফরের ফলাফল শুধু কিয়েভ নয়, ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে ইউক্রেনের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানবিক পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, অসংখ্য শহর ও জনপদ ধ্বংস হয়েছে এবং পুনর্গঠনের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা ইউক্রেন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এমন বাস্তবতায় হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠক কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সাক্ষাৎ নয়; বরং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, পশ্চিমা সমর্থনের ধারাবাহিকতা এবং সম্ভাব্য শান্তি উদ্যোগের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈঠক থেকে কী বার্তা আসে, তার ওপরই আগামী দিনে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কূটনৈতিক সমীকরণ অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে।