ওয়ানডের নেতৃত্বে পরিবর্তন, মিরাজের জায়গায় লিটন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ২৬ বার
ওয়ানডের নেতৃত্বে পরিবর্তন, মিরাজের জায়গায় লিটন

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবারও বদল আসতে যাচ্ছে নেতৃত্বের কাঠামোয়। ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজকে সরিয়ে বর্তমান টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসকে ৫০ ওভারের দলের নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তবে পরিবর্তনটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা ও অনুমোদনের পরই সিদ্ধান্তটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সানের প্রতিবেদনে বিসিবির একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে লিটন দাসই এখন সবচেয়ে এগিয়ে। একই সঙ্গে সাদা বলের দুই সংস্করণে অর্থাৎ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে তাওহিদ হৃদয়কে সহ-অধিনায়ক করার পরিকল্পনাও রয়েছে। টেস্ট দলের নেতৃত্বে থাকবেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ফলে কার্যকর হলে বাংলাদেশ আবারও তিন সংস্করণে তিন অধিনায়কের কাঠামো থেকে সরে এসে লাল বল ও সাদা বলের জন্য আলাদা নেতৃত্বব্যবস্থায় ফিরবে।

বিষয়টি নিয়ে বিসিবির বোর্ড সভায় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সভার সময় ২৯ জুলাই, বুধবার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ২৮ জুলাই প্রকাশিত খবরগুলো মূলত বোর্ডে আসন্ন আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি। তাই লিটনকে নতুন ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে আলাদা আলাদা সংস্করণের জন্য আলাদা অধিনায়ক রাখার নীতি নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুনে মেহেদী হাসান মিরাজকে ওয়ানডে অধিনায়ক করার পর আবার তিন সংস্করণে তিন অধিনায়কের ব্যবস্থা চালু হয়। তখন টেস্টে নাজমুল হোসেন শান্ত, ওয়ানডেতে মিরাজ এবং টি-টোয়েন্টিতে লিটন দাস দায়িত্ব পালন করছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলও মিরাজকে ১২ জুন ২০২৫ সালে শান্তর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ওয়ানডে অধিনায়ক করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে বিসিবি নেতৃত্বে ধারাবাহিকতার ওপর জোর দিয়ে মিরাজের ওয়ানডে অধিনায়কত্ব ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। একই বৈঠকে লিটন দাসের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্বও ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত বহাল রাখা হয়। ফলে তখনকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মিরাজ ও লিটনকে নিজ নিজ সংস্করণে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তনে আলোচনা তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে বোর্ড একদিকে সাদা বলের দুই সংস্করণে একই অধিনায়কের অধীনে দল পরিচালনার সুবিধা নিতে চাইছে, অন্যদিকে শান্তকে টেস্ট ক্রিকেটে নেতৃত্ব দেওয়ার ওপর মনোযোগী রাখতে চাইছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লিটন দাস বর্তমানে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক। ফলে ওয়ানডের দায়িত্বও তার হাতে গেলে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের নেতৃত্ব এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবে। ক্রিকেটের দুই ছোট সংস্করণে একই অধিনায়ক থাকলে দলের কৌশল, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা আনা সহজ হতে পারে—এমন বিবেচনাও বোর্ডের ভাবনায় থাকতে পারে।

অন্যদিকে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য শান্তকে আলাদা করে রাখার পরিকল্পনার পেছনেও রয়েছে সংস্করণভেদে নেতৃত্বের চাহিদা। পাঁচ দিনের ক্রিকেটে ধৈর্য, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও আলাদা ধরনের ম্যাচ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাই লাল বলের ক্রিকেটে শান্ত এবং সাদা বলের ক্রিকেটে লিটন—এমন কাঠামো কার্যকর হলে বাংলাদেশ একটি স্পষ্ট দুই-নেতৃত্বের মডেলে ফিরে যাবে।

মিরাজের অধিনায়কত্বের শুরুটা ছিল প্রত্যাশায় ভরা। ২০২৫ সালের জুনে দায়িত্ব পাওয়ার সময় তাকে একটি পরিবর্তনকালীন সময়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত নেতা হিসেবে বিবেচনা করেছিল বিসিবি। তার অলরাউন্ড সামর্থ্য, মাঠে সক্রিয়তা এবং দলের জন্য লড়াই করার মানসিকতা ছিল নেতৃত্ব দেওয়ার পক্ষে বড় কারণ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওয়ানডেতে দলীয় ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দেশের বাইরে মিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। ডেইলি সানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার নেতৃত্বে দেশের বাইরে ১৩টি ওয়ানডে খেলে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে মাত্র দুটিতে। এই পরিসংখ্যানই নেতৃত্ব পরিবর্তনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখানে অবশ্য মিরাজের নেতৃত্বকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন করাও পুরো চিত্র তুলে ধরে না। একজন অধিনায়কের সাফল্য নির্ভর করে দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স, খেলোয়াড়দের ফর্ম, ইনজুরি, প্রতিপক্ষের শক্তি, মাঠের পরিস্থিতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো একাধিক বিষয়ের ওপর। তাই নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার সরল ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বিসিবির বৃহত্তর দলীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

সাদা বলের ক্রিকেটে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য তাওহিদ হৃদয়কেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে বিসিবি। তাকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—দুই সংস্করণেই সহ-অধিনায়ক করার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। সম্প্রতি লিটনের অনুপস্থিতিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হৃদয়কে অধিনায়ক করা হয়েছিল। লিটনকে লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে অংশ নেওয়ার জন্য ছুটি দেওয়ার পর বিসিবি তাকে জিম্বাবুয়ে সিরিজের নেতৃত্ব দেয়।

এ ধরনের দায়িত্ব হৃদয়ের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক বিকল্প নেতৃত্ব নয়, ভবিষ্যতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বয়স ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার দিক থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় তাকে নেতৃত্বের কাঠামোয় রাখা হলে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির পথও প্রশস্ত হবে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। তবে এবার পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দলকে ওয়ানডে ক্রিকেটে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে ফেরানোর প্রয়োজন রয়েছে। এপ্রিলেই মিরাজকে ২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন পরিকল্পনার আলোচনা বোঝাচ্ছে, বোর্ড ফলাফল ও ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবছে।

লিটন শেষ পর্যন্ত ওয়ানডের দায়িত্ব পেলে তার সামনে থাকবে বড় চ্যালেঞ্জ। টি-টোয়েন্টির তুলনায় ওয়ানডেতে ম্যাচের দৈর্ঘ্য বেশি, কৌশলও বিস্তৃত। একই সঙ্গে দলের ব্যাটিং-বোলিং ভারসাম্য, খেলোয়াড়দের ফর্ম এবং বিদেশের মাটিতে ধারাবাহিক সাফল্য এনে দেওয়ার চাপও থাকবে। নেতৃত্বের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও লিটনের কাছ থেকে বড় অবদান প্রত্যাশা করবে দল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্ভাব্য এই পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট কতটা স্থিতিশীল কাঠামো পায়। একদিকে লিটন সাদা বলের দুই সংস্করণে নেতৃত্ব দিলে পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা আসতে পারে, অন্যদিকে শান্ত টেস্টে নিজের দায়িত্বে মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পাবেন। হৃদয়ের মতো তরুণদের নেতৃত্বের প্রস্তুতিও এগিয়ে যাবে। তবে সবকিছুর আগে প্রয়োজন বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং মাঠে তার কার্যকর বাস্তবায়ন।

অর্থাৎ মিরাজের অধ্যায় শেষ হওয়ার পথে থাকলেও এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে কেবল একজন অধিনায়কের পরিবর্তনের গল্প নয়। বরং লাল ও সাদা বলের ক্রিকেটে নেতৃত্বের দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করা হবে, ভবিষ্যতের অধিনায়ক কারা হবেন এবং ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে দলকে কোন কাঠামোয় প্রস্তুত করা হবে—এই বৃহত্তর প্রশ্নগুলোর উত্তরও লুকিয়ে আছে সম্ভাব্য এই পরিবর্তনের মধ্যে। এখন নজর বিসিবির বোর্ড সভার দিকে। সেখানেই পরিষ্কার হবে, লিটন দাস সত্যিই মিরাজের জায়গায় ওয়ানডে অধিনায়কের দায়িত্ব নিচ্ছেন কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত