বৃষ্টি-বন্যায় চড়া নিত্যপণ্যের বাজার, চাপে সাধারণ মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ বার
বৃষ্টি-বন্যায় চড়া নিত্যপণ্যের বাজার, চাপে সাধারণ মানুষ

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা বর্ষণ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়েছে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার কাঁচাবাজারে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে সবজি, মাছ, মাংস, ডিম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম। বাজারে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা যেমন দিশেহারা হয়ে পড়ছেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বাড়তি পাইকারি দামের কথা উল্লেখ করে মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাস্তব প্রভাবের পাশাপাশি এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছেন।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার, কেরানীগঞ্জ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ এবং উত্তরার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ১০০ টাকার নিচে অধিকাংশ মৌসুমি সবজি পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়া সবজির দাম এখন অনেকটাই বেড়েছে। বর্তমানে বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়, করলা ১২০ টাকা, ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শসা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে পেঁপে ও পটল, তবে সেগুলোর দামও আগের তুলনায় বেশি।

সবজির পাশাপাশি কাঁচামরিচের বাজারে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মাত্র এক মাস আগেও প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ এখন অনেক বাজারে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু অভিজাত এলাকার খুচরা বাজারে এর দাম আরও বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন এলাকায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় মরিচের ক্ষেতে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। অন্যদিকে চাহিদা অপরিবর্তিত থাকায় বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

একই সময়ে পেঁয়াজের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েকদিন আগেও প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা নাজমা বেগম বলেন, কয়েকদিন পরপর বাজারে এসে দেখছেন প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সংসারের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে, কিন্তু আয় একই রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান নয়াবাজারে কেনাকাটা করতে আসা দিনমজুর মাসুদ রানা। তিনি বলেন, বাজারে এসে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কোন পণ্য কিনবেন আর কোনটি বাদ দেবেন। প্রতিদিনের আয় দিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বিক্রেতারাও বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু খুচরা ব্যবসায়ীদের দায়ী করা ঠিক হবে না। কারওয়ান বাজারের একাধিক সবজি বিক্রেতা জানান, পাইকারি বাজার থেকেই তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। উৎপাদন এলাকায় বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং সড়ক যোগাযোগে বিঘ্নের কারণে সরবরাহ কমে গেছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। কেরানীগঞ্জের এক ব্যবসায়ী জানান, অনেক কৃষকের জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং এর প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়েছে।

শুধু কাঁচাবাজারেই নয়, প্রাণিজ আমিষের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ফার্মের মুরগির ডিম বর্তমানে ডজনপ্রতি প্রায় ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েকদিন আগেও ছিল প্রায় ১২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২১০ টাকায় পৌঁছেছে। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে। গরুর মাংসের দাম ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। মাঝারি আকারের রুই মাছ, যা এক সপ্তাহ আগেও ৩৫০ থেকে ৩৭০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং চাষের চিংড়ি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও ইলিশের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে এখন ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

মুদি পণ্যের বাজারেও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাবানের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে কাপড় ধোয়ার গুঁড়া বা ওয়াশিং পাউডারের দামও কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে চাল, আটা, ভোজ্যতেলসহ প্রধান খাদ্যপণ্যের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালের পাইকারি বাজারে কিছুটা দাম বাড়লেও পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়নি। তবে উন্নতমানের পোলাও চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে অনেক ক্ষেত্রে ২০০ টাকারও বেশি হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় টানা বৃষ্টির কারণে সবজিক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে নতুন সবজির সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং নতুন মৌসুমের সবজি বাজারে আসতে শুরু করলে ধীরে ধীরে দামের চাপ কমতে পারে। তবে এর জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, শুধু উৎপাদন ঘাটতি দিয়ে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সব ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। তাদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছেন। বাজারে কার্যকর নজরদারি এবং নিয়মিত অভিযান আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যেসব ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াচ্ছেন বা মূল্যতালিকা প্রদর্শন করছেন না, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারকে পুরোপুরি স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক হওয়া জরুরি বলে তারা মনে করছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্ষা মৌসুমে কিছু পণ্যের দাম বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে যদি মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার মাসিক নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য খাদ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে খাদ্য কেনার দিকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উৎপাদন এলাকায় দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা, পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখা এবং বাজারে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। ততদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অজুহাত করে যেন কোনো অসাধু চক্র অযৌক্তিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে না পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত