প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গ্রামীণ জনপদের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পেছনে নিত্যনতুন উদ্যোগ সবসময়ই এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসে। প্রচলিত চাষাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কোনো এলাকার মানুষ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও লাভজনক কোনো খাতের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন, তখন তা পুরো অঞ্চলের চেহারা পাল্টে দিতে পারে। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের একটি সাধারণ ও অবহেলিত জনপদ আজ বাণিজ্যিকভিত্তিক শোল মাছ চাষের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে এক দারুণ অনুকরণীয় মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এলাকার চারপাশের মানুষ এখন এই গ্রামটিকে আর দশটি সাধারণ গ্রামের মতো নয়, বরং গর্বের সঙ্গে ‘শোল মাছের গ্রাম’ হিসেবেই চেনেন ও সম্বোধন করে থাকেন। একসময়ের অর্থনৈতিক অনটনে জর্জরিত এই জনপদ আজ বাণিজ্যিকভাবে শোল মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে এক অনন্য গৌরব অর্জন করেছে এবং গ্রামের শতাধিক পরিবারের ভাগ্যের স্থায়ী পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে যে, পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের বাদুড়িয়া গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক ছোট-বড় পুকুর ও জলাশয়ে অত্যন্ত নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে শোল মাছের চাষ করা হচ্ছে। এই জনপদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গ্রামের প্রায় প্রতিটি মানুষই কমবেশি এই মৎস্য চাষের সঙ্গে নিজেদের ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছেন। বেকারত্ব ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার এই অদম্য নেশায় এখন গ্রামের যুবক থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষরাও কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা ছোট ছোট ডোবা থেকে শুরু করে মাঝারি আকারের পুকুর—সর্বত্রই এখন শোল মাছের সফল চাষের সুদৃশ্য ও ব্যস্ততম কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। মাছের জন্য মানসম্মত খাদ্য প্রস্তুত করা, পুকুরের নিয়মিত পরিচর্যা করা এবং উৎপাদিত মাছ বাজারে বিপণনের কাজকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রামজুড়ে এখন এক অভাবনীয় কর্মচাঞ্চল্য ও প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বাদুড়িয়া গ্রামের মাছ চাষিদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও দূরদর্শিতা এই খাতের সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। এখানকার প্রতিটি পুকুরের চারপাশ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বাঁশের চটা এবং বিশেষ জালের তৈরি নেট দিয়ে চারপাশ নিপুণভাবে ঘিরে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করা হয়েছে। এর ফলে পুকুরগুলোর চারপাশ যেমন অত্যন্ত পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দন দেখায়, তেমনই মাছ চাষের জন্য এক অত্যন্ত নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই বিশেষ ব্যবস্থার সুবাদে বিষাক্ত সাপ, বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় বা অন্য কোনো অবাঞ্ছিত প্রাণী চাইলেও পুকুরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। শোল মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি, সুরক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই জালের বেষ্টনী অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে, যা চাষিদের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে।
স্থানীয় প্রবীণ ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র কয়েক বছর আগেও এই গ্রামের বহু মানুষ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন কিংবা সামান্য কিছু কৃষিকাজের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থেকে জীবনযাপন করতেন। কিন্তু শোল মাছ চাষের এই যুগান্তকারী ধারণা আসার পর এবং তাতে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ার পর সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থার একেবারে দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে গ্রামের বহু পরিবার অত্যন্ত স্বচ্ছলভাবে জীবনযাপন করছে এবং তাদের দেখাদেখি নতুন নতুন উদ্যোক্তারাও প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে এই লাভজনক খাতে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন। অব্যবহৃত ও পড়ে থাকা পুকুরগুলো আজ বাদুড়িয়ার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার ও সোনালী সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
স্থানীয় সফল মৎস্যচাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাদুড়িয়া গ্রামের অধিকাংশ পুকুরের আয়তন সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় শতকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই আকৃতির প্রতিটি পুকুরে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে দুই হাজার থেকে শুরু করে আড়াই হাজার পর্যন্ত শোল মাছের পোনা সফলভাবে অবমুক্ত করা হয়। মাছের সুষম খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন সকালে এবং বিকেলে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ কেটে ছোট টুকরো করে খাদ্য হিসেবে সরবরাহ করা হয়। একটি মাঝারি আকৃতির পুকুরে দৈনিক প্রায় এক মণ পর্যন্ত এই বিশেষ তাজা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাছের শারীরিক বৃদ্ধি ও আকার যত বড় হতে থাকে, ঠিক সেই অনুপাতে খাদ্যের দৈনিক পরিমাণও ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই শোল মাছ চাষের আরেকটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো এতে নারীদের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে গ্রামের গৃহিণীদের অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে মাছের সুষম খাদ্য প্রস্তুত করার কাজে অংশ নিতে দেখা যায়। তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ কেটে নিখুঁতভাবে খাদ্য তৈরির এই কাজটি এখন বাদুড়িয়া গ্রামের প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন রুটিনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী সমাজের এই অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও বেশি গতিশীল ও মজবুত করে তুলেছে, যা সমাজ উন্নয়নে এক বিরাট ভূমিকা রাখছে।
গ্রামের অন্যতম সফল মৎস্যচাষি হাসানুজ্জামান তাঁর সাফল্যের গল্প শুনিয়ে জানান যে, তিনি মাত্র ছয় শতক আয়তনের ছোট্ট একটি পুকুরে দুই হাজার ছয়শ শোল মাছের পোনা ছেড়ে এই মাছ চাষের দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিলেন। নিয়মতান্ত্রিক পরিচর্যা ও সঠিক খাদ্যের সুবাদে মাত্র সাত থেকে আট মাসের ব্যবধানে প্রতিটি মাছের ওজন সাতশ গ্রাম থেকে এক কিলোগ্রাম পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এই পুরো সময়টিতে তাঁর সর্বমোট চার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো খরচ হয়, কিন্তু মাছ বিক্রির সময় তিনি সাত থেকে আট লাখ টাকার মাছ বাজারে বিক্রি করতে সক্ষম হন। এর ফলে তার ঘরে বেশ ভালো অঙ্কের মুনাফা থাকে, যা তার জীবনযাত্রার মান সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তিনি আরও জানান যে, এলাকার পাশের বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয় থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে সংগ্রহ করা ছোট পোনাগুলো প্রথমে মশারি বা বিশেষ নেটের তৈরি ঘেরে কিছুদিন আলাদাভাবে লালন-পালন করা হয় এবং উপযুক্ত আকার ধারণ করার পরেই সেগুলোকে মূল পুকুরে ছাড়া হয়।
আরেকজন সফল ও দূরদর্শী চাষি উজ্জ্বল গাজী গত বছর পনেরো শতক আয়তনের দুটি পুকুরে দুই হাজার ছয়শ সত্তরটি শোল মাছের চাষ করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। তিনি সেবার প্রায় নয় লাখ দশ হাজার টাকার মাছ বাজারে বিক্রি করেছিলেন, যার বিপরীতে তাঁর মোট উৎপাদন খরচ হয়েছিল প্রায় চার লাখ টাকা। তাঁর এই সফলতা দেখে তিনি আরও উৎসাহিত হয়েছেন এবং চলতি মৌসুমে সাড়ে চার হাজার পোনা অবমুক্ত করে প্রায় বারো থেকে তেরো লাখ টাকার মাছ বিক্রির আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। বাদুড়িয়ায় উৎপাদিত এই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর শোল মাছ এখন কেবল পাইকগাছা উপজেলার স্থানীয় বাজারের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দেশের বিভিন্ন বড় বড় অঞ্চলে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি শোল মাছ চারশ থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত চড়া মূল্যে বিক্রি হওয়ায় চাষিরা দারুণ লাভবান হচ্ছেন এবং দিন দিন এই লাভজনক মাছ চাষের পরিধি বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একসময় যে পুকুরগুলো কোনো প্রকার ব্যবহার ছাড়াই আগাছায় পূর্ণ হয়ে পড়ে থাকত, আজ সেগুলোই বাদুড়িয়ার মানুষের আয়ের সবচেয়ে প্রধান ও নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে উঠেছে। শোল মাছের এই বাণিজ্য চাষই মূলত বাদুড়িয়ার অবহেলিত মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই বিষয়ে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক অত্যন্ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছেন যে, এলাকার সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য যে সাহসী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসার যোগ্য। মৎস্য খাতের এই ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগ স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে ভবিষ্যতে আরও বহুগুণ সমৃদ্ধ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সরকারের পক্ষ থেকে উপজেলা মৎস্য বিভাগের মাধ্যমে এই চাষিদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হয়, যাতে তারা আরও বড় পরিসরে সফলতা অর্জন করতে পারেন।