তিস্তা তীর সংরক্ষণ প্রকল্প: এক সাব-ঠিকাদারের হাতে কাজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
তিস্তা তীর সংরক্ষণ প্রকল্প: এক সাব-ঠিকাদারের হাতে কাজ

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তিস্তার প্রমত্তা ও ভয়াল ভাঙন থেকে কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার সাধারণ মানুষকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করার এক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল নদীতীর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল। মোট একচল্লিশটি প্যাকেজে বিভক্ত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল নদীপাড়ের জনপদগুলোকে করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় একটি জনকল্যাণমূলক ও সংবেদনশীল প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে মূল ঠিকাদাররা নিজেদের নামে কাজ বরাদ্দ নিলেও পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের কমিশন বা লাভের আশায় পুরো কাজ একজনমাত্র সাব-ঠিকাদারের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছেন। এর ফলে বেশিরভাগ স্থানেই কোনো ধরনের কার্যকর তদারকি বা মনিটরিং থাকছে না, যার সুযোগ নিয়ে যত্রতত্র নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কাজের গতি অত্যন্ত শ্লথ করে দেওয়া হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সরকারি এই বিশাল অর্থের সঠিক ব্যবহার ও প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র প্রশ্ন ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রায় চৌদ্দ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই পূর্ব সতর্কতামূলক নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ পরিচালনার জন্য কাগজে-কলমে ভিন্ন ভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে সিংহভাগ কাজ পরিচালনা করছেন আবদুস ছালাম নামের একজন প্রভাবশালী সাব-ঠিকাদার। এলাকাবাসীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে যে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যিনি সাব-ঠিকাদারি কারবারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঠিক একই কায়দায় বর্তমান সময়েও নিজের এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বহাল রেখেছেন। নদী-তীরবর্তী অসহায় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একজনমাত্র ব্যক্তির হাতে অধিকাংশ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় এবং কাজের তদারকিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা থাকায় নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও অনেক ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে সামান্য পানির স্রোত বা সামান্য বর্ষা শুরু হলেই পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষের ভাষ্যমতে, এই একই প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ চলাকালীন সময়ে অতীতেও নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা এবং সরকারের নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অনেক কম ওমানের সিমেন্ট সরবরাহের মতো গুরুতর সব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যম ও জনগণের তোপের মুখে অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিন্মমানের কাজ বাতিল করে দ্রুত পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে পরবর্তীতে দৃশ্যমান বা আইনানুগ কোনো ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যার ফলে অসাধু ঠিকাদাররা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। রামহরি, বুড়িরহাট, কালীরমেলা ও পাড়ামৌলা গ্রামের একাধিক সাধারণ বাসিন্দা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে সাব-ঠিকাদার আবদুস ছালামের একক নিয়ন্ত্রণে সবকিছু পরিচালিত হওয়ায় এবং মাঠপর্যায়ে সরকারি কোনো তদারকি না থাকায় পুরো প্রকল্পে একচ্ছত্র অনিয়ম চলছে। বুড়িরহাট এলাকার সাধারণ বাসিন্দা ইফনুস আলী আক্ষেপ করে জানান যে নদীভাঙন রোধে তাদের এলাকার আশপাশের অধিকাংশ তীর সংরক্ষণ কাজই ওই একক সাব-ঠিকাদার নিজ মর্জিমাফিক পরিচালনা করছেন। রামহরি গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আরও যোগ করে বলেন যে একজন মাত্র ব্যক্তি যখন অধিকাংশ বড় বড় কাজ নিজের ইচ্ছামতো করতে থাকেন, তখন কাজের মান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয় এবং কাজের ফলাফলও অত্যন্ত খারাপ হয়।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে কাজের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশনের সাইড ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম এবং বেলাল কনস্ট্রাকশনের সাইড ম্যানেজার রাশেদুল ইসলাম এক প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেছেন যে মূল ঠিকাদাররা শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে কাজ করছেন নাকি সাব-ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছেন, সে বিষয়ে তাদের দপ্তরে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা নেই। অন্যদিকে, অভিযুক্ত সাব-ঠিকাদার আবদুস ছালাম তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে বলেছেন যে তিনি জোরপূর্বক কোথাও গিয়ে কখনো কাজ দখল করেননি। তার দাবি অনুযায়ী, যে সকল ঠিকাদার অফিশিয়ালি কাজ পেয়ে থাকেন, তারাই স্বউদ্যোগে তাকে ডেকে এনে কাজ বুঝিয়ে দেন। তবে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে গত বছরসহ এ পর্যন্ত তিনি অন্তত কুড়িটি প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন করেছেন, যদিও অন্যান্য প্যাকেজগুলোর বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ময়দুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান যে নাদিম কনস্ট্রাকশন চারটি, ইউনাইটেড ব্রাদার্স দুটি এবং বেলাল কনস্ট্রাকশন একটিসহ একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে পুরো প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে রয়েছে। তবে একই ঠিকাদারের হাতে একাধিক কাজ থাকায় সব স্থানে তাদের সরাসরি উপস্থিতি বা নজরদারি রাখা সম্ভব হয় না বলে তিনি স্বীকার করেন। সে সমস্ত ক্ষেত্রে তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধি, ম্যানেজার বা সাইট ইঞ্জিনিয়াররা কাজ পরিচালনা করে থাকেন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকেও সার্বক্ষণিক তদারকি বজায় রাখা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে ‘সালাম’ নামের কোনো ব্যক্তি সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছেন কি না, সে বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা নেই বলে উল্লেখ করে তিনি জানান যে সুনির্দিষ্ট বা লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান আরও স্পষ্ট করে বলেন যে তিস্তা তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে নিয়মানুযায়ী কোনো অনুমোদিত সাব-কন্ট্রাক্টর থাকার সুযোগ নেই, কারণ ই-জিপির মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত মূল ঠিকাদারদের সঙ্গেই কেবল তাদের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এর বাইরে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ পরিচালনা করে থাকে, তবে তার উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে প্রচলিত বিধি মোতাবেক কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ এ বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করে বলেছেন যে তিস্তা তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত