প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত জুলাই অভ্যুত্থানভিত্তিক একটি ঐতিহাসিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ঘটিত ন্যক্কারজনক হামলা, ভাঙচুর ও নেতাকর্মীদের আহত করার তীব্র নিন্দা এবং কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনীতির ধারা যখন সুসংহত হওয়ার কথা, ঠিক সেই মুহূর্তে শিক্ষাঙ্গনে এই ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ও রক্তপাতের পুনরাবৃত্তি পুরো জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এই আকস্মিক ও পরিকল্পিত হামলা কেবল একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচি ভণ্ডুল করার অপচেষ্টা নয়, বরং এটি দেশের মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার ওপর সরাসরি এক বিরাট আঘাত বলে মনে করছেন সচেতন শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম এবং সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এক যৌথ বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপনের পবিত্র মাহেন্দ্রক্ষণে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের পূর্বনির্ধারিত ও শান্তিপূর্ণ ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রদর্শনীর স্টলগুলো ভাঙচুর করা হয় এবং দায়িত্বরত নেতাকর্মীদের ওপর নৃশংস আক্রমণ চালানো হয়। এই বর্বরোচিত হামলায় ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় পাঠাগার সম্পাদক এবং সাবেক শাখা সভাপতি সোহেল রানাসহ বেশ কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ জনশক্তি গুরুতর আহত হন। প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির একটি ঐতিহ্যবাহী মঞ্চে এ ধরনের তাণ্ডব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
নেতৃবৃন্দ তাদের বিবৃতিতে আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান ক্যাম্পাসের এই সহিংসতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এর আগে গত ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্টের কক্ষে দাপ্তরিক বৈঠক চলাকালেও চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শিত হয়েছে। খোদ হল প্রভোস্টের উপস্থিতিতে এবং তাঁর সামনেই ছাত্রশিবির ও হল সংসদের দায়িত্বশীল নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী ধারাবাহিক এসব ন্যক্কারজনক ঘটনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সাধারণ শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা এবং শিক্ষক লাঞ্ছনার সংস্কৃতি এখনো ছাত্রদলের রাজনৈতিক কার্যক্রমে সম্পূর্ণভাবে জেঁকে বসেছে। অতীতে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আপামর ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করলেও একটি বিশেষ দল সেই রক্তাক্ত ধারা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি।
ক্ষমতার অন্ধ দম্ভ ও উগ্র অহংকারে মত্ত হয়ে ছাত্রদল আজ সম্পূর্ণভাবে ফ্যাসিবাদী আচরণের পুরোনো পথেই হাঁটছে বলে দাবি করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তারা অতীতকালের যাবতীয় সন্ত্রাসী ও সহিংস রাজনৈতিক ধারা থেকে একচুলও বেরিয়ে আসতে পারেনি। এমনকি চব্বিশের ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানে সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের অত্যন্ত নির্মম ও করুণ পরিণতি থেকে ন্যূনতম শিক্ষা গ্রহণ না করে তারা পুনরায় সেই একই সংঘাতমুখী রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির যখন দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, তাদের মৌলিক কল্যাণ সাধন এবং গঠনমূলক বিভিন্ন学术 কার্যক্রমে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে, ঠিক সেই সময় ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য বিস্তারের ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ আরও উল্লেখ করেন যে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের মতো কোনো শিক্ষার্থীবান্ধব ও গঠনমূলক কর্মসূচি না থাকায় ছাত্রদল বারবার শিক্ষার্থী নির্যাতন, হামলা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আলোচনার শিরোনামে থাকার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। অতীতে বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী সনি হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ নারী শিক্ষার্থীদের শ্লীলতাহানি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে শুরু করে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তেজগাঁওয়ে কলেজ শিক্ষার্থী হত্যা, দেশের নানা প্রান্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, নারী নির্যাতন এবং শিক্ষক লাঞ্ছনার মতো অসংখ্য রোমহর্ষক ঘটনা প্রমাণ করে যে, সহিংসতা ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি থেকে তারা আজও এক ইঞ্চিও সরে আসতে পারেনি।
উক্ত বিবৃতির মাধ্যমে নেতৃবৃন্দ এই ন্যাক্কারজনক ও কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বিচারবিভাগীয় তদন্তের জোরালো দাবি জানান। ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রকৃত হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জানমালের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান এবং শিক্ষার সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ যেকোনো মূল্যে বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি দ্রুত, দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ছাত্ররাজনীতির সুস্থ ধারার কোনো বিকল্প নেই বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।