প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের আলোচনা চলার পর অবশেষে কার্যকর হওয়া এই চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমন সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
চুক্তি অনুযায়ী, সিইপিএ কার্যকর হওয়ার পরপরই বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়ার ১ হাজার ৫৪টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে একই ধরনের সুবিধা পাবে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার আওতায় আসবে, যেখানে বাংলাদেশের বাজারে কোরিয়ার প্রায় ৮৭ শতাংশ পণ্য একই সুবিধা পাবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্যকে শুল্ক ও বাণিজ্যিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়। নতুন এই চুক্তির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি কিছুটা কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। এই পরিস্থিতিতে সিইপিএ চুক্তিকে রপ্তানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৪২ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৮৭ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে ওভেন পোশাকের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এ খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক। এছাড়া নিট পোশাক রপ্তানি থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য আয়।
পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের অন্যান্য পণ্যের উপস্থিতিও রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে। তামাক ও তামাকজাত বিকল্প পণ্য, জুতা ও জুতার যন্ত্রাংশ, উদ্ভিজ্জ তন্তু, পেপার ইয়ার্ন, চামড়াজাত পণ্য, হ্যান্ডব্যাগ এবং বিভিন্ন তৈরি টেক্সটাইল সামগ্রী দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে।
তবে বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো সীমিত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিবছর প্রায় ১২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক আমদানি করে। বিশ্বের মোট পোশাক আমদানির প্রায় ৩ শতাংশ এই বাজারের অংশ।
এত বড় বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ভোক্তাদের উচ্চমূল্যের ফ্যাশনপণ্যের চাহিদা, পণ্যের বৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতা এবং চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর শক্ত অবস্থান।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে মূলত মৌলিক পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে উচ্চমূল্যের, উন্নত ডিজাইনের এবং প্রযুক্তিনির্ভর পোশাকের চাহিদা বেশি। ফলে এই বাজারে সফল হতে হলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা মনে করছেন, সিইপিএ কার্যকর হওয়ার ফলে পোশাক খাতে নতুন গতি আসবে। তাদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রেতারা দীর্ঘদিন ধরেই একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রত্যাশা করছিলেন।
বিজিএমইএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হওয়া কিছু পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক দিতে হয়। নতুন চুক্তির ফলে সব ধরনের পোশাক একই সুবিধার আওতায় আসবে। এতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য বাজারে প্রতিযোগিতা করা সহজ হবে।
তবে শুধু শুল্ক সুবিধা পেলেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে না বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বড় অংশীদারত্ব তৈরি করতে হলে পণ্যের মান, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা এবং দ্রুত ডেলিভারি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বর্তমানে তৈরি পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে নতুন নতুন পণ্য ও বাজার তৈরি করা জরুরি। সিইপিএ চুক্তি সেই পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের বর্তমান চিত্রেও ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হয় প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।
অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। নতুন চুক্তির মাধ্যমে এই ভারসাম্য কিছুটা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ শুধু রপ্তানি আয় বাড়ানোর বিষয় নয়, এটি প্রযুক্তি বিনিময়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্প সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ যদি সিইপিএর সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুধু তৈরি পোশাক নয়, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং অন্যান্য রপ্তানি খাতেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া সিইপিএ চুক্তি দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। তবে এই সুযোগকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ওপর জোর দিতে হবে।