যুক্তরাষ্ট্রের পৌনে দুই লাখ ভিসা বাতিল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
যুক্তরাষ্ট্রের পৌনে দুই লাখ ভিসা বাতিল
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও পরাশক্তি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের অত্যন্ত কঠোর এবং আপসহীন অভিবাসননীতির সরাসরি অংশ হিসেবে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপে পৌনে দুই লাখের বেশি বিদেশি নাগরিকের বৈধ ভিসা বাতিল করেছে। আল জাজিরার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সদ্য প্রকাশিত একটি বিশেষ তথ্যবিবরণীতে এই চাঞ্চল্যকর ও কঠোর সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই দেশটির অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে একের পর এক কঠোর নীতি কার্যকর করা হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে লাখ লাখ অভিবাসী ও বিদেশি নাগরিকের ওপর খড়্গ নেমে এসেছে। এই বিশালসংখ্যক ভিসা বাতিলের ঘটনার পাশাপাশি একই সময়জুড়ে আরও হাজার হাজার মানুষের বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণ ও অভিবাসনসংক্রান্ত বৈধ সুবিধা সম্পূর্ণভাবে বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে অভিবাসনপ্রত্যাশী ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ওই তথ্যবিবরণীতে ভিসা বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণগুলোর অত্যন্ত বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে যে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়া, ভিসার পূর্বশর্ত ও নীতিমালা লঙ্ঘন করা, নথিপত্র বা তথ্যে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া, সামাজিক বা রাজনৈতিক সহিংসতায় নানাভাবে উসকানি দেওয়া এবং সর্বোপরি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ যেকোনো কার্যক্রম ভিসা বাতিলের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিগত বছরগুলোতে যারা বিভিন্ন উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন কিংবা প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকের কাছেই আইনসম্মত ও বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অভিবাসনবিরোধী অভিযানের জেরে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বর্তমান প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মার্কিন জননিরাপত্তা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য তারা যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করছে না।
নিয়মিত এবং কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই এই বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। এর মাধ্যমে মূলত এটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, বর্তমান সময়ের ভিসাধারীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আইন ও ভিসার শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলছেন কি না এবং তারা দেশটির সাধারণ নাগরিকদের জন্য বা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হুমকি বা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন কি না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের এই অবস্থানে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক ঘটনার কথা উদাহরণ হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের একটি অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অপর এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অত্যন্ত নৃশংসভাবে অপহরণ এবং মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের নিষিদ্ধ উপকরণ নিজের কাছে সংরক্ষণ করার এক ডজনেরও বেশি গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, যার ফলে তাদের ভিসা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।
সাধারণ অপরাধের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সংবেদনশীল ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে মার্কিন প্রশাসন। পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে যে, উত্তর আফ্রিকার একটি নির্দিষ্ট মার্কিন দূতাবাস থেকে ‘বার্থ ট্যুরিস্ট’ হিসেবে বিশেষ উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকারী একশরও বেশি বাবা-মায়ের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। মূলত মার্কিন মুলুকে সন্তান প্রসব করার উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়ার পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে তাদের নবজাতক সন্তান জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্বের আইনি সুবিধা লাভ করতে পারে। এ ছাড়াও সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী রক্ষণশীল অধিকারকর্মী চার্লি কার্ককে নির্মমভাবে হত্যার একটি বর্বরোচিত ঘটনার পর সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশকারী বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের ভিসা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজ অ্যাকাউন্টে অত্যন্ত উগ্র ভাষায় লিখেছিলেন যে, ফ্যাসিস্টরা মারা গেলে গণতন্ত্রপন্থীরা কখনোই এ নিয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ করে না। অন্য একজন মন্তব্য করেছিলেন যে ওই কর্মী আরও অনেক আগেই মারা যাওয়া উচিত ছিল। এ ধরনের উগ্র ও সহিংস মন্তব্যকারীদের মার্কিন ভূখণ্ডে বসবাসের কোনো অধিকার নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ শান্তি কিংবা সার্বিক নিরাপত্তার জন্য সামান্যতম হুমকি বা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত যেকোনো বিদেশি নাগরিককে দ্রুত শনাক্ত করার এবং তাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ওপর নিবিড় তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে। পররাষ্ট্র দপ্তরের নীতিগত বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া মূলত একটি বিশেষ সুযোগ মাত্র, এটি কোনোভাবেই জন্মগত বা মৌলিক কোনো অধিকার নয়। এই সুযোগের যারা ন্যূনতম অপব্যবহার করবে কিংবা মার্কিন আইন অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে ভিসা বাতিলসহ দেশের বিদ্যমান সমস্ত কঠোর আইনি ক্ষমতা ও এখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করা হবে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের দিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গণমাধ্যমের কাছে এক লক্ষের বেশি ভিসা বাতিলের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল, যা সেই সময় বিশ্বজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক ভিসা বাতিলের ঘটনা বলে বিবেচিত হয়েছিল। তবে বর্তমান নতুন ও হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী সেই সংখ্যা এখন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির চরম কড়াকড়ির বাস্তব চিত্রকেই ফুটিয়ে তোলে।
শুধু ভিসার সংখ্যা বাতিল করাই নয়, বরং বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে যেকোনো ধরনের ভিসা প্রদান করার ক্ষেত্রেও নজিরবিহীন কড়াকড়ি ও কঠোর নীতি আরোপ করা হয়েছে। ভিসা লাভের জন্য আবেদনকারী প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গতদিনের কার্যক্রম, পোস্ট, কমেন্টস এবং অনলাইন আচার-আচরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিজিটাল যাচাইয়ের পরিধি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অধিকারকর্মী ও বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মার্কিন প্রশাসনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যাচাইয়ের এই বিতর্কিত উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, প্রশাসনের এ ধরনের অতি কড়াকড়ির পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য একটি বড় ধরনের মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি সাধারণ অভিবাসীদের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি, অযথা হয়রানি এবং তাদের সমাজ থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার চরম ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অভিবাসী সমাজের মাঝে গভীর হতাশা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত