১২ শিক্ষক, পরীক্ষার্থী একজন—তবু পাস করাতে পারেনি মাদ্রাসা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৩ বার

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দাসনাইপাড়া ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ১২ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া একমাত্র শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সোমবার (১০ আগস্ট) ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে এলে স্থানীয়ভাবে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার পরও একজন শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় মাদ্রাসাটির পাঠদানের মান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কার্যকর যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মাদ্রাসাটি নাঙ্গলকোট উপজেলার রায়কোট উত্তর ইউনিয়নের দাসনাইপাড়া এলাকায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চলতি বছর দাখিল পরীক্ষার জন্য দুই শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে একজন পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সেই শিক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়েছে।

ফলে চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্য। একজন পরীক্ষার্থীকে নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল এখন স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মান নির্ধারণ করা যায় না। একজন শিক্ষার্থীর ফলাফলের পেছনে তার ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, পারিবারিক পরিবেশ, নিয়মিত উপস্থিতি, মানসিক প্রস্তুতি এবং পরীক্ষার সময়কার পারফরম্যান্সসহ নানা বিষয় ভূমিকা রাখে। তবে একই সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার পরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে না পারলে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদানের কার্যকারিতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি একাডেমিক সহায়তার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ১২ জন, অথচ দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী একজন—তবু তাকে পাস করানোর মতো একাডেমিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গেল না কেন। তারা শুধু ফলাফল নিয়ে সমালোচনা না করে প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেসব বিষয় যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

অভিভাবকদের কেউ কেউ মনে করছেন, কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে শুধু তাকে দায়ী না করে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাদান পদ্ধতিও মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ একজন শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করে সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও রয়েছে। বিশেষ করে দাখিলের মতো পাবলিক পরীক্ষার আগে নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে কোন বিষয়ে শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে, তা শনাক্ত করা গেলে অতিরিক্ত ক্লাস বা বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে।

দাসনাইপাড়া ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. একরামুল হক জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান থেকে চলতি বছর দুই শিক্ষার্থীর দাখিল পরীক্ষার ফরম পূরণ করা হয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে একজন পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং সেই শিক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়েছে। ফলাফলের বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করেছেন।

নাঙ্গলকোট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউনুস জানিয়েছেন, দাসনাইপাড়া ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

শুধু দাসনাইপাড়া মাদ্রাসাই নয়, উপজেলার আরও একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়েও কর্তৃপক্ষের নজর পড়েছে। শ্যামপুর এখলাছিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ও ফলাফল নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু পরীক্ষায় পাসের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করে তোলাও একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল একটি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রমের অন্তত একটি দৃশ্যমান চিত্র তুলে ধরে। সেই জায়গা থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় দাখিল পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষাজীবনে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দাখিল উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক বা আলিম পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য শুধু একটি ফলাফল খারাপ হওয়া নয়, তার পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পরিকল্পনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা। শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করত কি না, শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান করেছেন কি না, প্রতিষ্ঠানটিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পর্যাপ্ত কি না, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

একই সঙ্গে শুধু শিক্ষকসংখ্যা দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বিচার করাও যথাযথ নয়। শিক্ষক কতজন রয়েছেন তার পাশাপাশি তারা কতটা নিয়মিত পাঠদান করছেন, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কতটা চিহ্নিত করছেন এবং পরীক্ষার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি দিচ্ছেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আবার শিক্ষার্থীর নিজের আগ্রহ, উপস্থিতি ও প্রস্তুতির বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

তাই দাসনাইপাড়া ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার এবারের ফলাফলকে ঘিরে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর শুধু সমালোচনার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ানো নয়; শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারে।

এবারের ফলাফল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য তাই একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। একজন শিক্ষার্থীও যদি পরীক্ষায় অংশ নেয়, তার শিক্ষাগত অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ একাডেমিক সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের পর্যালোচনার মাধ্যমে কোনো ঘাটতি ধরা পড়লে তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই এই ধরনের ফলাফল ভবিষ্যতে উন্নতির সুযোগে পরিণত হতে পারে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত