পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় এলাকাবাসী এবং মামলার এজাহার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই মর্মান্তিক ও কলঙ্কজনক ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৫ এপ্রিল রাতের আঁধারে। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ফকরাবাদ মৌজার একটি নির্জন এলাকায় অবস্থিত নরেন্দ্রনাথ মন্ডলের ছেলে পলাশ মন্ডলের মৎস্য ঘের। ঘটনার দিন গভীর রাতে ওই এলাকার সহজ-সরল, বাকপ্রতিবন্ধী ও শারীরিকভাবে দুর্বল নারীকে একা পেয়ে নরেন্দ্রনাথ মন্ডলের ছেলে এবং স্থানীয় মৎস্য ঘেরের মালিক পলাশ মন্ডল কুপ্রস্তাব দেন এবং জোরপূর্বক তাকে নিজের মৎস্য ঘেরের মাছের বাসায় তুলে নিয়ে যান। সেখানে সম্পূর্ণ নিরুপায় ও অসহায় ওই নারীর ওপর পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সমাজের দুর্বল ও প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনি লড়াইয়ে তাদের অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী ঘের মালিক এই জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করেন। ঘটনার পরপরই লম্পট পলাশ মন্ডল বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায় এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। কিন্তু দিনের পর দিন বঞ্চনা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েও পরিবারটি শেষ পর্যন্ত পিছু হটেনি। সমাজের নানা রক্তচক্ষু ও ভয়ের দেয়াল ভেঙে ন্যায়বিচারের আশায় আশাশুনি থানায় উপস্থিত হন ভুক্তভোগীর বৃদ্ধ ও অসহায় বাবা। তিনি বাদি হয়ে আশাশুনি থানায় একটি সুনির্দিষ্ট ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন, যা স্থানীয় থানা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
মামলা রুজু হওয়ার পর থেকেই আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জ শামীম আহম্মেদ খানের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক ফিরোজ আলম অভিযুক্তকে পাকড়াও করতে মাঠে নামে। দীর্ঘ অনুসন্ধান, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সোমবার ফকরাবাদ গ্রামে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। নিজ বসতবাড়ি থেকেই অভিযুক্ত মৎস্য ঘেরের মালিক পলাশ মন্ডলকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। সোমবার বিকেলেই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করার পর তাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরার বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে, এই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং বাকপ্রতিবন্ধী ভুক্তভোগী নারীকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে যা যা করণীয়, তার সবকিছুই আইনানুগভাবে নিখুঁতভাবে করা হবে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী বা অর্থশালী হোক না কেন, নারী ও প্রতিবন্ধীদের ওপর নির্যাতনকারী কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
এদিকে এই লোমহর্ষক ঘটনার পর থেকেই পুরো আশাশুনি উপজেলা তথা গোটা সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে তীব্র নিন্দা, ধিক্কার ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। স্থানীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ এই পৈশাচিক কাজের তীব্র ভাষা নিন্দা জানিয়েছেন এবং অভিযুক্ত পলাশ মন্ডলের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন। একজন শারীরিক ও বাকপ্রতিবন্ধী নারীর ওপর এ ধরনের অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন কেবল একটি সাধারণ ফৌজদারি অপরাধই নয়, বরং এটি মানবতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সভ্য সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তিমূলের ওপর এক গভীর কালো দাগ। সমাজের মূল স্রোত থেকে বহু দূরে অবস্থানকারী এবং নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য কথা বলতে অক্ষম এমন একজন মানুষের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই জঘন্য ঘটনা সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সমাজের কুচক্রী ও লম্পটরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে কঠোরভাবে চলবে এবং অপরাধী উপযুক্ত শাস্তির মুখোমুখি হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের পৈশাচিকতা করার দুঃসাহস আর কেউ দেখাতে না পারে।