প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের আকাশপথ এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের স্তরে উন্নীত করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন করা হয়েছে। গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করে কোনো অপরাধী যাতে চটজলদি বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে কিংবা বিদেশ থেকে অপরাধ করে দেশে ফিরে এসে পুনরায় লুকিয়ে থাকতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির এক অভেদ্য ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যদি কেবল অভিযুক্ত বা পলাতক অপরাধীর একটি মাত্র ছবিও থাকে, তবে তা দিয়েই তাকে চিরতরে আটকে ফেলা সম্ভব। অপরাধী যখনই দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাটিতে পা রাখবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই উন্নত এআই ক্যামেরা তার মুখাবয়ব শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা সংকেত পাঠাবে এবং মুহূর্তের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়বে সেই কাঙ্ক্ষিত আসামি।
বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র ও ত্রুটিহীন করার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আওতায় দেশের তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এক অদৃশ্য জাল। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে কার্যকর করা হয়েছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত বিশেষ ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা। বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা, নিখুঁত ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ সিস্টেম এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল গোল্ড ডিটেকশন প্রযুক্তি। এর ফলে প্রথাগত নিরাপত্তার দিন শেষ হয়ে এখন বিমানবন্দরগুলো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর এক শক্তিশালী সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, যা অপরাধী ও চোরাকারবারীদের মনে দারুণ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের যেকোনো প্রান্তে জঘন্য কোনো অপরাধ করে কোনো অপরাধী যদি পাসপোর্ট ছাড়া কিংবা অন্যের জাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে রাতের আঁধারে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়, তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা কেবল তার একটি ছবি বিমানবন্দরে দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সরবরাহ করলেই এই হাই-টেক প্রযুক্তি তার স্বয়ংক্রিয় কাজ শুরু করে দেয়। ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেমের এই আধুনিক প্রযুক্তি বিমানবন্দরের অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা যেমন অ্যারাইভাল ও ডিপার্চার টার্মিনাল, প্রতিটি বোর্ডিং ব্রিজ, ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং কার্গো ভিলেজে বসানো হাই-টেক এআই ক্যামেরার সাহায্যে পলকের মধ্যে ওই ব্যক্তির মুখমণ্ডল নিখুঁতভাবে ম্যাচ করে। সামান্য মিল পাওয়া মাত্রই এটি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে অটোমেটেড অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়। শুধু পলাতক অপরাধীই নয়, বিমানবন্দরে কোনো ব্যক্তি যদি দীর্ঘক্ষণ ধরে অত্যন্ত অস্বাভাবিক আচরণ করেন কিংবা কোনো পরিত্যক্ত সন্দেহজনক বস্তু পড়ে থাকে, তবে এআই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক করে দিতে সক্ষম।
বর্তমান সময়ের অপরাধ চক্র এবং চোরাচালানকারীরা নিত্যনতুন এবং অভিনব কৌশল অবলম্বন করে সোনা পাচারের মতো অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। সোনা কখনো তরল আকারে, কখনো পেস্ট বানিয়ে আবার কখনো শরীরের বিশেষ অংশে লুকিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে পাচারের চেষ্টা করা হয়। প্রথাগত স্ক্যানার বা সাধারণ তল্লাশির মাধ্যমে অনেক সময় এই ধরনের সূক্ষ্ম অপরাধ ধরা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যুক্ত হওয়া আধুনিক ও বিশ্বমানের গোল্ড ডিটেকটিভ মেশিন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জামাকাপড়ের নিচে কিংবা শরীরের ভেতরে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধাতব বস্তু ও সোনা অনায়াসে শনাক্ত করতে সক্ষম। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা বা অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়াই চোরাচালান রোধের কার্যকারিতায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এভিয়েশন খাতের সার্বিক নিরাপত্তা এবং এই প্রযুক্তি চালুর সাফল্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য তথা নিরাপত্তা বিভাগের এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য জানিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, বিমানবন্দরে যেসব সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের নিজস্ব অর্থায়নে এই বিশ্বমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কিনে তা সফলভাবে ব্যবহার করছে। এর পাশাপাশি বেবিচকের নিজস্ব এভসেক সিকিউরিটিও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এই ধরনের উন্নত টেকনিক্যাল ইকুইপমেন্ট ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে বিগত দু-আড়াই বছরের ব্যবধানে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এক ঈর্ষণীয় ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদও এই বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে লুকিয়ে থাকা অপরাধী ও সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীদের কঠোরহস্তে দমন করতে নিয়োজিত প্রতিটি সংস্থা সর্বদা হাই-টেক ইকুইপমেন্ট দিয়ে তাদের সার্বিক নজরদারি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং আধুনিক যুগের তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি তাল মিলিয়ে বিমানবন্দর পরিচালনা ও নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিমানবন্দরগুলোর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এই এআই প্রযুক্তির ডিজিটাল নজরদারি একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। অপরাধের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার এই নিরলস প্রচেষ্টা আগামী দিনে আরও বেশি গতি পাবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।