প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তাদের সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে শুরুর জন্য বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে বেছে নিয়েছে। দলের চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দলকে তৃণমূল পর্যায় থেকে নতুন করে সাজানোর বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর এই তিন সাংগঠনিক জেলার কমিটি ঢেলে সাজানোর মাধ্যমে সৃষ্ট এই সফল ‘মডেল’কে অনুসরণ করেই পরবর্তীতে সমগ্র দেশের প্রতিটি প্রান্তে দলকে আরও বেশি শক্তিশালী ও গতিশীল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত হোটেল র্যাডিসনে বিএনপি এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় ও তৃণমূলের নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্বয়ং তারেক রহমান এই সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
বৈঠকে দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, অতীতে যাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি কোনোভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে যারা দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে পারেন, এ ধরনের কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকে আর কোনোভাবেই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে আসার সুযোগ দেওয়া হবে না। এর পরিবর্তে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত শিক্ষিত, মার্জিত, পরিচ্ছন্ন ইমেজসম্পন্ন এবং ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। মূলত দলের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উক্ত বিশেষ বৈঠকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা, দক্ষিণ জেলা এবং মহানগর বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় সাতশত শীর্ষস্থানীয় ও দায়িত্বশীল নেতা সরাসরি উপস্থিত থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই নতুন পরিকল্পনা গভীর মনোযোগের সাথে শুনেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে আরও বেশি সুসংহত করার বহুমুখী চেষ্টা চালিয়ে আসছেন বিএনপির নীতির্ধারকরা। এর পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২২ সালের শুরুর দিকে যখন তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছিলেন, ঠিক সেই সময়ই চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপিকে একটি আদর্শ ও অনুসরণীয় ‘পুনর্গঠনের মডেল’ হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য তিনি একটি বিশেষ রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। সেই বিশেষ পরিকল্পনা সময়মতো বাস্তবে রূপ দিতে সে সময় দলের অভিজ্ঞ ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খানকে (যিনি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন) প্রধান দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। সে সময় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোড়জোড় শুরু হয়েছিল এবং নগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে দফায় দফায় দীর্ঘ বৈঠকও করেছিলেন আহমেদ আযম খান। এমনকি দল পুনর্গঠনের কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি বিশেষ উপকমিডিও গঠন করা হয়েছিল। যদিও নানা জটিল ও অনিবার্য বাস্তবতার কারণে সেই পরিকল্পনা মাঝপথে গিয়ে থমকে গিয়েছিল এবং পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই পুরনো প্রক্রিয়া ও রূপরেখা অনুসরণ করেই বন্দরনগরীতে দলকে নতুনভাবে সাজানোর বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, দলের নির্ধারিত গঠনতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী খুব শীঘ্রই বিএনপির জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখেই তৃণমূল পর্যায়ে দলকে পুনর্গঠন করার অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, কোনো অবস্থাতেই কোনো সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা অযোগ্য ব্যক্তিকে দলের কোনো পদে বা নেতৃত্বে পুনর্বাসিত করা হবে না। একই সুরে কথা বলেছেন দলের স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, যারা অতীতে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে জড়িত ছিলেন এবং যাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অতীতে দলের বদনাম হয়েছে, তাদের যেকোনো ধরনের সাংগঠনিক কর্মসূচি ও নেতৃত্ব থেকে দূরে রেখেই বিএনপিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান। বৈঠক শেষে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, চট্টগ্রামকে একটি সাংগঠনিক মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়ে এবং সেই সুনির্দিষ্ট রূপরেখা অনুসরণ করেই মূলত দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও দল পুনর্গঠন করার সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। লন্ডনে অবস্থানকালেই তিনি এই অত্যন্ত চমৎকার উদ্যোগটি গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ আযম খান এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করার জন্য মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু নানা অনিবার্য রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সে সময় কাজটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বর্তমান সময়ে তারেক রহমান আবারও মাঠপর্যায়ে দলকে শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও গতিশীল করে তোলার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন। আমরা তার সেই আগের রূপরেখা এবং আজকের বাস্তবতাকে সামনে রেখেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুনর্গঠনের এই কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে শুরু করতে যাচ্ছি।

তবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে দল পুনর্গঠন কাজটি খুব একটা সহজ হবে না। নেতায় নেতায় বিদ্যমান দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, আধিপত্য বিস্তার এবং তীব্র কোন্দলের কারণে এর আগে তৃণমূল পর্যায়ে পুনর্গঠন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। বিগত ২০২৪ সালের ৭ জুলাই এরশাদউল্লাহকে আহ্বায়ক এবং নাজিমুর রহমানকে সদস্য সচিব করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নগর বিএনপি মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড কমিটিগুলো ভেঙে দিলেও নানা অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে নতুন করে কমিটিগুলো গঠন করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ের প্রায় সব কটি কমিটি একসঙ্গে ভেঙে দিলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও নতুন কোনো কমিটি আলোর মুখ দেখেনি, যা নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করেছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির রাজনীতিতে, যেখানে চরম কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের জেরে দলের সামগ্রিক সাংগঠনিক অবস্থা সম্পূর্ণ টালমাটাল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা, ওপেন চাঁদাবাজি এবং এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রায় নিয়মিতই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই রাউজান উপজেলায় একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে, যা সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গনকে নাড়া দিয়েছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শুধু রাউজানেই প্রায় ২৫টি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী গোলাগুলি এবং সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মী। সর্বশেষ গত ১৩ জুন রাউজান উপজেলায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। এমন একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও রক্তক্ষয়ী প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামে দলের নতুন পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যে কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।