প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের বর্তমান কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং ছাত্ররাজনীতির অন্দরে শুরু হয়েছে এক নতুন জল্পনা-কল্পনা। গত বছরের শুরুর দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করা বর্তমান কমিটির দুই বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন স্তরের পদপ্রত্যাশী তরুণ নেতাদের মাঝে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের প্রায় প্রতিটি ইউনিটের সাংগঠনিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন করে নতুন ও গতিশীল একটি কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন বর্তমান নেতারা। এখন শুধুমাত্র সংগঠনটির সাংগঠনিক অভিভাবক এবং দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সবুজসংকেত পাওয়ার অপেক্ষা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে যেকোনো মুহূর্তে নতুন এই কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
ছাত্রদলের সাংগঠনিক গঠনতন্ত্রের খসড়া নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ মেয়াদকাল দুই বছর নির্ধারিত রয়েছে। সেই হিসেবে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকেই বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির নেতৃত্বাধীন কমিটির মেয়াদ সমাপ্ত হয়েছে। আর তখন থেকেই শুরু হয়েছে পদপ্রত্যাশী তরুণ নেতাদের তীব্র লবিং, তদবির এবং দলের নীতিনির্ধারক ও সিনিয়র নেতাদের মন জয় করার নানামুখী প্রচেষ্টা। নিজেদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদানের কথা তুলে ধরে হাইকমান্ডের সুনজরে আসার জন্য তরুণ নেতারা নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে, ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ফাইলটি বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতার টেবিলে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে ছাত্রদলের ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি উপহার দেওয়া বর্তমান রাকিব-নাছির জুটির সফল ও ঘটনাবহুল একটি অধ্যায়।

বর্তমান কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব গণমাধ্যমে দেওয়া তাঁর মন্তব্যে জানিয়েছেন যে, তাঁদের ওপর অর্পিত সাংগঠনিক দায়িত্বের সিংহভাগ কাজই ইতিমধ্যে সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক যখনই সমীচীন ও প্রয়োজন মনে করবেন, তখনই দেশবাসীর সামনে নতুন কমিটির নাম ঘোষণা করা হবে। বিএনপি এবং ছাত্রদলের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতার সাথে আলাপকালে জানা গেছে যে, আসন্ন এই নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বহুমুখী সমীকরণ মেলাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির আগামী দিনের রাজপথের কঠোর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য ছাত্রদলের এই নতুন কমিটির নেতৃত্ব কতটা দক্ষ, সাহসী এবং দূরদর্শী হবে, তার ওপর সংগঠনের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে। সেই কারণে অতীতের যেকোনো সময়ের মতো কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের পকেট কমিটি বা নির্দিষ্ট কোনো মহলের মাইম্যান তৈরির সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ পরীক্ষিত, আস্থাভাজন, মেধাবী ও স্মার্ট নেতৃত্ব বাছাই করার কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ভাবছেন দলটির হাইকমান্ড। পাশাপাশি বিগত দিনের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে সম্মুখসারিতে থেকে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন, পুলিশি হামলা, মামলা ও কারাবরণের ভয়কে উপেক্ষা করে দলের শীর্ষ সিদ্ধান্ত বিশ্বস্ততার সাথে বাস্তবায়ন করেছেন, এমন ডেডিকেটেড তরুণদেরই মূল্যায়ন করা হবে।
সংগঠনের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন যে, বর্তমান প্রজন্মের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুখ-দুঃখে যারা সবসময় পাশে থেকেছেন এবং চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক আউটলুকের দিক থেকে যারা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত নেতা হিসেবে মানানসই, তাদেরই শীর্ষ পদের জন্য বেছে নেওয়া উচিত। অতীতে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সঠিক সময়ে নিয়মিত কমিটি গঠন করা সম্ভব না হওয়ায় সংগঠনের ভেতর এক ধরনের নেতৃত্বজট তৈরি হয়েছিল। এই নেতৃত্বজট ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার মাধ্যমে মেধাবী ও পরিশ্রমী একটি বড় অংশের তরুণ নেতার সম্ভাব্য ঝরে পড়া রোধ করা এখন সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি। ব্যাচের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণ করা এবং আগামী দিনগুলোতে নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময়ে নতুন কমিটি ঘোষণার বিষয়টি হাইকমান্ডকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। অতীতের ত্যাগ-তিতিক্ষা, রাজপথের আপসহীন নেতৃত্ব এবং আগামীর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দলের শৃঙ্খলা অটুট রাখার স্বার্থে এবারও ছাত্রদলের শীর্ষ দুটি পদ ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আসার জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতারা।
সাবেক ছাত্রনেতা এবং বর্তমান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশ, এবারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী শিক্ষাবর্ষের ব্যাচের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বিগত বছরগুলোতে নানা নিপীড়নের শিকার হওয়া ত্যাগী নেতারা মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন এবং নেতৃত্বজটের কারণে ঝরে পড়ার শঙ্কায় থাকা সম্ভাবনাময় তরুণরা নতুন করে কাজ করার প্রেরণা পাবে। সেই হিসেবে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের শিক্ষাবর্ষের ঠিক পরবর্তী সময়কার ব্যাচগুলো থেকে নতুন শীর্ষ নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার জোরালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন হলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা এবং দুঃসময়ে ছাত্রদলের পক্ষে সাহসী ভূমিকা পালনকারী বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা বর্তমানে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা রয়েছেন। তাদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন এবং রাজপথে পুলিশের দমনপীড়নের শিকার হওয়ার তথ্যগুলো নতুন কমিটির দৌড়ে তাদের যথেষ্ট এগিয়ে রাখছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত থাকা সম্ভাবনাময় তরুণ নেতাদের মধ্যে অনেকের নামই এখন দলের অন্দরে বেশ জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। বিগত দিনের কারাবরণ, রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করা এবং রাজপথের পরীক্ষিত মুখ হিসেবে পরিচিত একাধিক নেতা বর্তমান কমিটির শীর্ষ পদগুলোর জন্য নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। ফ্যাসিবাদী আমলের চরম দুঃসময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার কারণে যাদের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের হয়েছিল এবং যারা দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে বা কারাভোগ করে সাংগঠনিক কার্যক্রম টিকিয়ে রেখেছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের এই পরিশ্রমী ও মেধাবী ছাত্রনেতারা দলের দুর্দিনে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তা কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের নজর কেড়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সাথে যুক্ত না থেকে সম্পূর্ণ ক্লিন ইমেজের অধিকারী এসব তরুণ নেতার হাতেই আগামী দিনের ছাত্রদলের নেতৃত্ব অর্পিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অঙ্গসংগঠনের বেশ কয়েকজন পরীক্ষিত নেতা নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়ার জোর দাবিদার হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এবং বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকা ত্যাগী মুখেরাও কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসার জন্য নিজেদের জোরালো উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সরাসরি আহত হয়েছেন কিংবা চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য মানবিক কার্যক্রমে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাদের মধ্য থেকেও যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। ছাত্রদলের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, তাঁদের দায়িত্ব পালনকালে দেশের প্রায় দুই হাজার একশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা সংগঠনের ইতিহাসে একটি বিরল রেকর্ড। মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে দেশের প্রায় প্রতিটি ইউনিটে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে বিদায়ী কমিটি, যা আগামী দিনে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে আরও বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলবে।
পরিশেষে, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান কমিটির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও সংগঠনের কার্যক্রম কোনোভাবেই স্থবির হয়ে পড়ে নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা এবং নিরলস তত্ত্বাবধানে খুব দ্রুতই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, গতিশীল এবং যুগোপযোগী নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি জাতির সামনে আত্মপ্রকাশ করবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলের এই নতুন নেতৃত্ব কেবল একটি ছাত্রসংগঠন পরিচালনা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আগামী দিনে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সুসংহত করার আন্দোলনে এক অগ্রণী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে। কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা পকেট কমিটির প্রভাবমুক্ত থেকে সম্পূর্ণ মেধা, যোগ্যতা, ত্যাগ এবং সাহসিকতার মূল্যায়নের মাধ্যমে গঠিত হতে যাওয়া এই নতুন ছাত্রদল কমিটি দেশের তরুণ সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবে এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির রাজনৈতিক ভিতকে আরও অনেক বেশি মজবুত ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংগঠনের কোটি কোটি নেতাকর্মী।