লোডশেডিং ও ভূতুড়ে বিলে অতিষ্ঠ মতলব উত্তর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
লোডশেডিং ও ভূতুড়ে বিলে অতিষ্ঠ মতলব উত্তর
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত মতলব উত্তর উপজেলায় বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের চরম অবনতি এবং তার সাথে যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত ও অবিশ্বাস্য বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একদিকে ভ্যাপসা গরম আর তীব্র তাপপ্রবাহের মাঝে লাগাতার অসহনীয় লোডশেডিংয়ের জনদুর্গোভ, অন্যদিকে এর ঠিক সমান্তরালে গ্রাহকদের পকেট কাটার মতো চড়া মূল্যের ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল—সব মিলিয়ে এই উপজেলার লক্ষাধিক বিদ্যুৎ গ্রাহক এক গভীর ও অসহনীয় সংকটের মুখে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতির এই দুর্দিনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার মতো বাড়তি কোনো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, উদাসীনতা এবং খামখেয়ালি আচরণের কারণেই সাধারণ গ্রাহকরা পদে পদে প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদ ঘুরে সাধারণ গ্রাহকদের সাথে কথা বলে যন্ত্রণার এক ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। উপজেলার ইসলামাবাদ গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা দুলাল দর্জি গণমাধ্যমের কাছে তাঁর দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, তাঁদের সাধারণ পরিবারের ছোট আকারের এই বাসাটিতে গত কয়েক মাস আগেও নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকারও কম বিদ্যুৎ বিল আসত। কিন্তু বিগত জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিলের কাগজ হাতে পাওয়ার পর তাঁদের চোখ কপালে ওঠার দশা হয়েছে, কারণ সেই মাসে তাঁদের বিল এসেছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। অথচ এই প্রচণ্ড গরমে দিনের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় তাঁরা পাখা বা কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সেভাবে ব্যবহারই করতে পারেননি। একইভাবে সুজাতপুর গ্রামের আরেক সাধারণ বাসিন্দা নয়ন দাস অভিযোগ করে জানান যে, তাঁদের ঘরে সাধারণ একটি বা দুটি বাল্ব ও একটি ফ্যান ব্যবহার করার সুবাদে প্রতি মাসে সাধারণত তিন শ থেকে সাড়ে তিন শ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল আসত। কিন্তু এবারের জুলাই মাসের বিলের কাগজে দেখা গেছে তাঁদের বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে সোজা ছয় শ ৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
শুধু সাধারণ আবাসিক গ্রাহকরাই নন, বরং এই ভয়াবহ লোডশেডিং এবং ভূতুড়ে বিলের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন উপজেলার ছোট ও মাঝারি ধরনের খুচরা ব্যবসায়ীরাও। স্থানীয় একজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী অংকন দাস তাঁর বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন যে, তাঁর ছোট্ট দোকানটিতে বিগত দিনগুলোতে নিয়মিতভাবে এক হাজার তিন শ থেকে এক হাজার চার শ টাকার মধ্যে বিদ্যুৎ বিল আসত। অথচ বর্তমান মাসের চরম লোডশেডিংয়ের এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতেও তাঁর দোকানে দুই হাজার দুই শ টাকার বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায় মন্দা থাকার পরও এই অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গ্রাহকদের সার্বিক অভিযোগ সূত্রে জানা যায় যে, এই পুরো উপজেলার ভেতরে ২৪ ঘণ্টার দীর্ঘ একটি দিনের মধ্যে প্রায় ১৮ ঘণ্টাই কোনো ধরনের বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। দিনের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎহীন থাকার পরও কীভাবে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি বিল আসতে পারে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর রহস্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গ্রাহকদের এই ক্ষোভ ও যন্ত্রণার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি দুইয়ের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার বা এজিএম মো. নাইম জানান যে, বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে চাহিদার তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ পাওয়ার কারণেই মূলত এই অঞ্চলে তীব্র লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁর তথ্যমতে, মতলব উত্তর উপজেলায় এই মুহূর্তে বিদ্যুতের প্রকৃত দৈনিক চাহিদা প্রায় সাতাশ মেগাওয়াট হলেও তারা বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে নামমাত্র মাত্র ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাচ্ছেন। তবে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক বা ভূতুড়ে আসার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে তিনি বলেন যে, মিটার রিডিং অনুযায়ী গ্রাহকরা যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, নিয়মানুযায়ী ঠিক ততটুকুই বিল হওয়ার কথা। কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সচেতন মহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো, বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে কম থাকলেও গত দুই মাস ধরে লাগাতারভাবে এলাকার সাধারণ গ্রাহকদের অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও মনগড়া ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই দুর্যোগপূর্ণ অর্থনৈতিক সময়ে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। যখন এই বিষয়ে প্রতিকার পাওয়ার আশায় ভুক্তভোগী গ্রাহকরা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করছেন, তখন মতলব উত্তর জোনাল অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা গ্রাহকদের সাথে চরম অসদাচরণ করছেন এবং নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কোনো ধরনের নিয়মতান্ত্রিক মিটার রিডিং বা পরিমাপ ছাড়াই টেবিল বসে নিজেদের ইচ্ছামতো মনগড়া ও অতিরিক্ত টাকার বিল তৈরি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেই কাল্পনিক ও অতিরিক্ত অংকের বিলগুলো প্রিন্ট করে সাধারণ গ্রাহকদের বাড়িতে বাড়িতে বিতরণ করা হচ্ছে। এই জনবিরোধী খামখেয়ালিপনার ফলে মতলব উত্তর উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহক চরম হয়রানি ও আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত