মির্জা ফখরুলের মন্তব্যের প্রতিবাদ জামায়াত এমপিদের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
মির্জা ফখরুলের মন্তব্যের প্রতিবাদ জামায়াত এমপিদের
প্রকাশ: ১২ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নেতৃবৃন্দের দেওয়া নানা মন্তব্য ঘিরে নতুন করে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক একটি রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের উত্তর জনপদের রাজনীতিতে এক ধরনের উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোট এগারোজন সংসদ সদস্য একযোগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেছেন। গত মঙ্গলবার রাতে রংপুর জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টারে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা মন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, এ দেশের যেকোনো অঞ্চলের সাধারণ মানুষ কোন রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শকে ভোট দেবেন, সেটি সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। উন্নয়নের মতো একটি মৌলিক বিষয়ের সাথে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক পছন্দ বা সিদ্ধান্তকে শর্তযুক্ত করা বা মেলবন্ধন ঘটানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগে গত রবিবার রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত অত্যন্ত জমজমাট একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রংপুরের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও পছন্দ নিয়ে একটি মন্তব্য করেছিলেন। মন্ত্রীর সেই বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, তিনি সেখানে বলেছিলেন, রংপুরের মানুষেরা সবসময়ই উন্নয়ন ও অন্যান্য দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়া। কেন এই জনপদ পিছিয়ে রয়েছে? কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, এ অঞ্চলের মানুষ নাকি সবসময় সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি বুঝতে পারেন না। যখন বিএনপি সরকার গঠন করে, তখন এখানকার মানুষ হয়তো অন্য দল বা জাতীয় পার্টিকে সমর্থন করেন; আবার যখন অন্য কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়, তখন তারা জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মন্ত্রী প্রশ্ন রেখেছিলেন যে, এভাবে বারবার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করলে এলাকার উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব এবং মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত ফল কীভাবে পাবে? মন্ত্রীর এই ধরনের মন্তব্যকে ঘিরেই মূলত রংপুর অঞ্চলের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন যে, রংপুরের সাধারণ মানুষ বিএনপি কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য কোনো দল বা মতাদর্শকে সমর্থন করার কারণে যদি দেশের সার্বিক উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকে বা বঞ্চিত হয়, তবে এ ধরনের অসংগত বক্তব্য কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রংপুর-৩ আসনের সম্মানিত সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল সংবাদ সম্মেলনে তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্যে বলেন যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো একজন জ্যেষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই ধরনের মন্তব্য বাংলাদেশের সংবিধান কর্তৃক স্পষ্টভাবে ঘোষিত বাক, ব্যক্তি ও নিজস্ব মতামত প্রকাশের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। পাশাপাশি এটি রংপুর অঞ্চলের সচেতন সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি একধরনের চরম অসম্মান প্রদর্শনের শামিল।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয় যে, একটি নির্বাচিত ও দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান এবং পবিত্র দায়িত্ব হলো দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম ও সমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সেই মৌলিক বিবেচনা থেকেই যুগ যুগ ধরে অবহেলিত ও তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা রংপুর অঞ্চলকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ ও কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে বলে এই জনপদের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করে আসছে। কিন্তু এর পরিবর্তে রাজনৈতিক পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় মানুষের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। রংপুরের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকার প্রসঙ্গে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা পরিষ্কার ভাষায় বলেন যে, বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের একজন সাধারণ নাগরিক কিংবা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন বা সমর্থন করবেন, তা সম্পূর্ণভাবে তাদের ব্যক্তিগত ও নিজস্ব গণতান্ত্রিক অধিকার। জনগণের পবিত্র ভোট কোনো বিশেষ সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশের পূর্বশর্ত বা লাইসেন্স হতে পারে না। সরকার সব সময় ক্ষমতায় থাকবে আপামর জনগণের কল্যাণের জন্য, জনগণের পরিশোধিত করের অর্থে এবং দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের সঠিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। ফলে দেশের কোনো অঞ্চলের মানুষ যদি স্বাধীনভাবে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করেন, তবে তার কারণে ওই অঞ্চলের জনগণের মৌলিক উন্নয়ন কোনোভাবেই ব্যাহত বা সীমিত করা হবে—এ ধরনের মানসিকতা বা ধারণা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।
সংবাদ সম্মেলনে উত্তরের এই জনপদের দীর্ঘদিনের বেশ কিছু অমীমাংসিত উন্নয়নসংকটের চিত্রও অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তুলে ধরা হয়। নেতৃবৃন্দ জানান যে, এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রধান এবং দীর্ঘমেয়াদি দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের চিরতরে অবসান ঘটানো, শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, নতুন নতুন শিল্পায়ন গড়ে তোলা, আধুনিক শিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল আধুনিকায়ন করা এবং বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ আঞ্চলিক দীর্ঘদিনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা। এই সমস্ত জনকল্যাণমূলক কাজগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব, এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংসদ সদস্যরা বলেন যে, রংপুরের মানুষ অতীতে কোন রাজনৈতিক দলকে তাদের ভোট দিয়েছেন বা আগামী দিনে কাকে দেবেন, তার সাথে আঞ্চলিক উন্নয়নকে শর্তযুক্ত করা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত হতে পারে না।
পরিশেষে, সরকারের প্রতি অত্যন্ত জোরালো আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা বলেন যে, রংপুরের সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য অর্জনের কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার হতে পারে না। বাংলাদেশের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে রংপুরের প্রতিটি মানুষ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সমান অধিকার এবং ন্যায্য উন্নয়নের সমান দাবিদার। কোনো ধরনের দলীয় সংকীর্ণতা বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য না রেখে দলমত-নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আবদুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আল ফারুক আব্দুল লতিফ, নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী ও নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম, গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল করিম, গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম এবং গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেছসহ রংপুর বিভাগের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত