শিল্পায়নের ঘোষণায় আশাবাদী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
শিল্পায়নের ঘোষণায় আশাবাদী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহল
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আভাস পাওয়া গেছে। সম্প্রতি দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকালে প্রদত্ত অত্যন্ত দূরদর্শী ও সময়োপযোগী বক্তব্যে শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে আশাবাদী রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, তাতে গভীর সন্তোষ ও আশার আলো দেখছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শীর্ষ শিল্পপতি এবং বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বিশেষ করে মীরসরাই থেকে শুরু করে মাতারবাড়ী পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন করা, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে, তাকে দেশের বর্তমান অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও মাইলফলক পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন তারা।
তবে সরকারের এই সুমহান ও সম্ভাবনাময় ঘোষণা এবং পরিকল্পনার পাশাপাশি চট্টগ্রামের স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যমান কিছু গুরুতর সংকটের কথা উল্লেখ করে তাদের গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের কথাও অকপটে প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, পরিকল্পিত শিল্পায়ন সফল করার আগে অবশ্যই চট্টগ্রামে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কনটেইনারজট, পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ, ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়া, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন এবং সামগ্রিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। গত রবিবার বন্দরনগরীর অদূরে বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের পুনর্বাসন কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন যে, মীরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত বিস্তৃত করিডরে পরিকল্পিত শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার মাধ্যমে অত্র অঞ্চলে লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। এছাড়া সাম্প্রতিক চীন সফরের অনন্য সফলতার কথা উল্লেখ করে তিনি চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক হাব বা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথাও দেশবাসীকে অবহিত করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী ও উদ্দীপনাময় বক্তব্যকে চট্টগ্রামের সার্বিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে গ্রহণ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁদের সুদৃঢ় অভিমত হলো, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রাণকেন্দ্র এই বন্দরনগরীতে শিল্পায়নের যে বিশাল সম্ভাবনার কথা সরকার বারবার উচ্চারণ করছে, তা যদি সততা ও দক্ষতার সাথে বাস্তবে রূপায়ন করা সম্ভব হয়, তবে তার সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব কেবল চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র বাংলাদেশকেই এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। দেশের স্বনামধন্য বাণিজ্য সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সম্মানিত সভাপতি আমিরুল হক গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে অত্যন্ত জোরালোভাবে জানিয়েছেন যে, জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর ও এই জনপদ সর্বদাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জনপদকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী যে সুদূরপ্রসারী রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন, তা এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী সমাজকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত ও আশাবাদী করে তুলেছে।
চেম্বার সভাপতি আরও বলেন যে, চট্টগ্রামের সমগ্র বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অংশজুড়ে রয়েছে অপার সম্ভাবনাময় বিশাল সমুদ্র। এই বিস্তীর্ণ সমুদ্রের জলরাশি, জীববৈচিত্র্য ও সামুদ্রিক অর্থনৈতিক সম্পদকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, তা চট্টগ্রাম তথা গোটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী নতুন সম্ভাবনার সোনালী দুয়ার উন্মোচন করতে পারে। এর অবধারিত ফলশ্রুতিতে দেশে নতুন নতুন দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও সম্প্রসারিত হবে। দেশের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা এখন অত্যন্ত আশার বুক বেঁধে অপেক্ষা করছেন যে, সরকার অতি দ্রুত এই সমস্ত চমৎকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তবে নতুন শিল্পায়নের এই মহাঞ্চলয়ে নামার আগে শিল্পোদ্যোক্তাদের অন্যতম প্রধান ও মৌলিক প্রত্যাশা হিসেবে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তথা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামের অনেক বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প-কারখানায় হঠাৎ করেই গ্যাসের মারাত্মক চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘনঘন বিপজ্জনক ওঠানামা এবং সামগ্রিক জ্বালানি সংকটের কারণে নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে বারবার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
নতুন নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী ভাবনার পাশাপাশি বর্তমানে সচল থাকা বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়া যেকোনো মূল্যে স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা। তাদের জোরালো বক্তব্য হলো, দেশে নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে সবার আগে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনে এই আস্থার নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তাদের কারখানাগুলো নিয়মিত, নির্বিঘ্ন ও নিরাপদভাবে ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে। জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে যদি কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা বা স্থবিরতা বজায় থাকে, তবে তা কেবল বড় শিল্পপতিদেরই নয়, বরং দেশের মেরুদণ্ডস্বরূপ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেবে। জ্বালানি খাতের এই চরম সংকট নিরসনের দাবিতে গত আট জুলাই সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলাদা দুটি সুনির্দিষ্ট চিঠি পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। ওই চিঠিতে বর্তমান সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ইস্যুতে দেশের কষ্টার্জিত শিল্পমালিকদের জন্য বিশেষ ভর্তুকি ও ছাড় দেওয়ার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার কারণে তৈরি পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী খাতসহ দেশের সমস্ত ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প-কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া আজ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। পর্যাপ্ত ও সময়মতো জ্বালানির চরম অভাবে ইতিমধ্যেই অনেক সচল কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা মালিকপক্ষ বাধ্য হয়ে অলিখিত ‘লে-অফ’ বা উৎপাদন স্থগিত ঘোষণা করতে কার্পণ্য করেনি। তবে আশার কথা হলো, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা চেম্বারের পাঠানো এই চিঠি ও দাবির বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ শুরু করেছেন। চেম্বার সভাপতি আশা প্রকাশ করেন যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই জ্বালানি সংকটের একটি স্থায়ী ও সন্তোষজনক সমাধান দেশের ব্যবসায়ী সমাজ দেখতে পাবে। প্রধানমন্ত্রীও তাঁর বক্তব্যে দেশের সামগ্রিক শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দৃঢ় পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যা ব্যবসায়ীদের মনে নতুন করে ভরসা জুগিয়েছে।
আসন্ন শিল্পায়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কেবল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর না করে দেশের স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও সমানভাবে এবং সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন সচেতন ব্যবসায়ীরা। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রামে চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে যদি একসঙ্গে কয়েকশ নতুন মিল-কারখানা স্থাপিত হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মেধাবী উদ্যোক্তাদের জন্যও ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সুনির্দিষ্ট দাবি হলো, বিদেশি বহুজাতিক বিনিয়োগকারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করতে গিয়ে যেন দেশের তিল তিল করে গড়ে ওঠা দেশীয় উদ্যোক্তাদের কোনোভাবেই কোণঠাসা বা উপেক্ষিত করা না হয়। স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বড় বড় বিদেশি কোম্পানির পারস্পরিক সরবরাহ ব্যবস্থা, কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহন ও অন্যান্য সেবা খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে যদি একটি সুষম ও লাভজনক অংশীদারিত্ব বা সাপ্লাই চেইন তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে তার সুফল সমগ্র দেশের অর্থনীতিতে আরও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী ও টেকসই হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিজিএমইএর সম্মানিত পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত সময়োপযোগী মন্তব্য করে বলেছেন যে, বিদেশি উদ্যোক্তারা আমাদের দেশে এসে বিনিয়োগ করুক এবং ব্যবসা পরিচালনা করুক, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেই অত্যন্ত ভালো একটি দিক; তবে সেই প্রক্রিয়াটি কখনোই স্থানীয় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ অবমূল্যায়ন বা উপেক্ষা করে হতে পারে না। বিদেশি বড় বিনিয়োগকারী এবং দেশের মাটি ও মানুষের সাথে জড়িত স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অত্যন্ত সুষম ও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে যদি যৌথভাবে কাজ করা যায়, তবে দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। দেশের স্থানীয় উদ্যোক্তা সমাজ যদি কোনো কারণে হারিয়ে যায় বা কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তবে কেবল বিদেশি বিনিয়োগের ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে খুব একটা ভালো অবস্থানে টিকতে পারবে না। নতুন অন্তর্বর্তী ও নির্বাচিত সরকার দেশের এই মৌলিক বাস্তবতা অনুধাবন করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সাথে নিয়েই পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবে বলে তিনি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং সুস্থ বিনিয়োগের সংস্কৃতি নিশ্চিত করার জন্য অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হিসেবে দেশের সামগ্রিক শান্তি-শৃঙ্খলা কঠোরভাবে বজায় রাখার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যবসায়ী নেতারাও একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, যেকোনো ধরনের নতুন ও বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ। বর্তমান ব্যবস্থার নানামুখী জটিলতার কথা তুলে ধরে ব্যবসায়ী নেতারা জানান যে, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত কোনো পণ্যের কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্ট বা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আইনগতভাবে সম্পন্ন হতেই অযথা আট থেকে দশ দিন দীর্ঘ সময় অপচয় হয়ে যায়। অথচ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্য খালাসের জন্য মাত্র চার দিন সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরই অত্যন্ত কঠোরভাবে ডেমারেজ চার্জ বা জরিমানার অর্থ আদায় করা শুরু করে। ফলে আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ বিনা কারণে পঞ্চম দিন থেকেই অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে বাধ্য হতে হয়।
কাস্টমসের এই ধরনের দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বিত পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ কার্যকরী মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল মাসের পর মাস বন্দর ইয়ার্ডে আটকে থাকে। এর ফলে সময়মতো কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জরুরি পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং অনেক সময় বন্দর ইয়ার্ডের খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ পড়ে থেকে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান পণ্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। বিজিএমইএর পরিচালক অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেপজা এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেজাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে বরং অত্যন্ত সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে। এই সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মূলত দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি করার প্রধান চালিকাশক্তি। এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে যদি সামান্য ফাইল নাড়াচাড়ার ক্ষেত্রেও অযথা দিনের পর দিন সময় নষ্ট হয়, তবে তা সমগ্র দেশের উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে।
উদ্যোক্তাদের সার্বিক মতামত অনুযায়ী, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনে আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে হলে সরকারি নীতিমালার সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা, যেকোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা, সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত জমি ও গ্যাস-বিদ্যুতের মতো প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী নেতারা অত্যন্ত দূরদর্শী বিশ্লেষণ করে জানান যে, অদূর ভবিষ্যতে মীরসরাই এবং মাতারবাড়ী অঞ্চলে যখন শত শত নতুন শিল্প-কারখানা পুরোদমে উৎপাদনে যাবে, তখন উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্য সাগরে বা স্থলপথে বিদেশে রপ্তানি করার বিশাল চাপ গিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের ওপরই পতিত হবে। এই অবধারিত বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তারা জোর দাবি জানিয়েছেন যে, নতুন কোনো বিনিয়োগ বা শিল্পায়ন বাস্তবায়নের ঘোষণার পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিক অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা, পণ্য খালাসের দীর্ঘ সময় ও জটিলতা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের সড়ক, মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার মান বিশ্বমানে উন্নীত করার কাজটি এখনই দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।
সর্বোপরি, দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সমাজের সুনির্দিষ্ট অভিমত হলো, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে বর্তমান অযাচিত সময় ও বাড়তি ব্যয় যেকোনো উপায়ে সফলভাবে কমিয়ে আনা গেলে চট্টগ্রামকে খুব সহজেই দক্ষিণ এশিয়ার একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, আধুনিক ও আকর্ষণীয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র বা গেটওয়ে হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি নীতিনির্ধারক মহল এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের এই যৌথ বোঝাপড়া ও আন্তরিক সহযোগিতাই আগামী দিনে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে বলে দেশবাসীর মনে জোরালো প্রত্যয় জন্ম নিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত