রিহ্যাবের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আবাসন খাতে স্থবিরতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার
রিহ্যাবের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আবাসন খাতে স্থবিরতা
প্রকাশ:  ১২ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আবাসন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা রিহ্যাবের নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথাতেই এক গভীর ও মারাত্মক অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়েছে। রিহ্যাবের শীর্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সদস্যের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও অসন্তোষের জেরে ইতিমধ্যে সংগঠনটির বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম এক মাসের জন্য স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সাথে উদ্ভূত এই পুরো সংকটের নেপথ্যের কারণ এবং দুই পক্ষের আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে নিয়োগ করা হয়েছে। এমনিতেই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবাসন খাত এক প্রকার দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ও স্থবিরতার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে, ঠিক এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে রিহ্যাবের অভ্যন্তরীণ এই নেতৃত্বহীনতা ও বিশৃঙ্খলা পুরো খাতটিকে আরও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংগঠনের একাধিক দায়িত্বশীল ও শীর্ষ নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, রিহ্যাবের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের ভেতরের এই কোন্দল বা বিরোধের সূত্রপাত মূলত একেবারেই আকস্মিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গত ছাব্বিশ জুলাই রিহ্যাবের সহসভাপতি মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাসের নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদের দশজন সদস্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হয়ে সংগঠনের বর্তমান কার্যপ্রণালী ও বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে বারোটি সুনির্দিষ্ট দফা সম্বলিত একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেন। ওই অভিযোগে প্রধানত দাবি করা হয় যে, গত বাইশ জুলাই পরিচালনা পর্ষদের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা সাধারণ সম্মতি ছাড়াই সংগঠনের সভাপতি ড. আলী আফজাল এবং জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের যৌথ স্বাক্ষরে ব্যাংকের হিসাব থেকে নগদ দুই কোটি টাকা উত্তোলন করা হয় এবং সেই অর্থ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান হিসেবে প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয়, গত তিন মাসের সংক্ষিপ্ত কার্যকালে বোর্ডের পূর্বানুমোদন ছাড়াই আরও প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকা যথেচ্ছভাবে খরচ করা, নতুন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া, বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করা এবং নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এককভাবে গ্রহণ করার মতো গুরুতর অভিযোগও সভাপতির বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিপরীতে রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজালের নেতৃত্বে ষোলজন পরিচালক ও সহসভাপতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ও লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেছেন। তাদের সেই ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বোর্ড সভাতেই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে রিহ্যাবের পক্ষ থেকে একটি উপযুক্ত আর্থিক অনুদান প্রদান করার নীতিগত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের সুনির্দিষ্ট সময় ও সুযোগ অত্যন্ত হঠাৎ করে নির্ধারিত হওয়ায় পুনরায় জরুরি ভিত্তিতে আরেকটি বোর্ড সভা আহ্বান করার কোনো পর্যাপ্ত সময় বা সুযোগ ছিল না। ফলে সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থেই পূর্বের নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে সেই অর্থ প্রদান করা হয়েছিল।
তবে রিহ্যাবের অভ্যন্তরীণ একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের গভীর বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হলেও সেখানে রিহ্যাবের সব সহসভাপতি ও পরিচালকদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। মূলত প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে কিছু শীর্ষ নেতা ও পরিচালককে বাইরে রাখা এবং তাদের সাথে না নেওয়ার ঘটনার ফলেই একাংশের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষের দানা বাঁধতে শুরু করে। পরবর্তীতে সেই ব্যক্তিগত অসন্তোষ এবং ক্ষোভ খুব দ্রুতই বোর্ড পরিচালনা পদ্ধতি, আর্থিক তহবিল ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে একটি প্রকাশ্য ও তীব্র বিরোধের রূপ ধারণ করে, যা শেষ পর্যন্ত গড়ায় মন্ত্রণালয়ের দরজা পর্যন্ত।
এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান যে, পরিচালনা পর্ষদের ভেতরের সামান্য কিছু মতপার্থক্য বা ভুল বোঝাবুঝিকে আলোচনার টেবিলে সমাধান না করে সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ানো অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ঘরোয়া বিষয় বাইরে নিয়ে যাওয়ার কারণে সামগ্রিকভাবে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং রিহ্যাবের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। অথচ সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র সমস্যার একটি সুন্দর সমাধান বের করা অনেকটাই সহজ ছিল।
অপরদিকে, সহসভাপতি মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তাঁর সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে যোগাযোগ করা হলে রিহ্যাবের পরিচালক মোড. মাহবুবুর রহমান সংগঠনের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, তাদের এই বিরোধ বা আপত্তির মূল কারণ মোটেও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান প্রদান করা নয়। তাদের আসল আপত্তি এবং ক্ষোভের জায়গাটি হলো বোর্ডের আনুষ্ঠানিক বা লিখিত অনুমোদন না নিয়ে এত বড় অঙ্কের একটি বিশাল পরিমাণ অর্থ এককভাবে ব্যয় করা এবং পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যদের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা।
সংগঠনের সভাপতি ড. আলী আফজাল তাঁর বিরুদ্ধে আনীত যাবতীয় অভিযোগ সম্পূর্ণরুপে প্রত্যাখ্যান করে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে মোট পাঁচজন নেতার নাম পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সরকারি নিরাপত্তার বিভিন্ন প্রটোকল এবং ছাড়পত্র যাচাই-বাছাই শেষে কেবল সভাপতিসহ মাত্র তিনজনের নামে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি বা ক্লিয়ারেন্স আসে। এই অনিবার্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার কারণেই অন্য সব সদস্যদের সাথে নিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। সেখান থেকেই মূলত কিছু নেতার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এবং অনভিপ্রেত অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল, যা পরবর্তীতে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
রিহ্যাবের সাধারণ সদস্য এবং আবাসন খাতের সাথে জড়িত বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নানা বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশের আবাসন শিল্পে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। ফ্ল্যাট ও প্লট কেনাবেচা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে এমনিতেই ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই কঠিন সময়ে রিহ্যাবের মতো একটি শীর্ষস্থানীয় সংগঠনের নেতৃত্ব যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তবে পুরো খাতটি অভিভাবকহীন হয়ে পড়বে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক এজিএম স্থগিতকরণ এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের মাঝে হতাশা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থে এবং আবাসন খাতের স্থবিরতা দূর করার জন্য অতি দ্রুত দুই পক্ষের মধ্যকার সকল ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্ব দূর করে একটি শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত