নিউজিল্যান্ডের জোরালো সমর্থন চায় বাংলাদেশ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৪ বার

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়ার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের জোরালো সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ অর্জন এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের ক্ষেত্রেও দেশটির সক্রিয় সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আতাউর রহমান খান। ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদও এতে অংশ নেন। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড এবং ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ডের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেয়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। এ বিষয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে বাংলাদেশ যে আবেদন করেছে, তার পক্ষে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়।

এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজারে শুল্ক সুবিধা, বাণিজ্য প্রতিযোগিতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। তাই উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তার পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের আবেদনটি বিবেচনার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড যেন বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন দেয়, সে আহ্বান জানানো হয়।

এলডিসি উত্তরণের পাশাপাশি আরসিইপিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরসিইপির ভূমিকা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এ জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নতুন বাজার, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আরসিইপির সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্যিক শৃঙ্খলা ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বিভিন্ন নীতি ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিদের জানানো হয়।

বাংলাদেশের জন্য আরসিইপিতে যোগদানের বিষয়টি শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তির সদস্য হওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে দেশের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এ অঞ্চলের বড় বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও একটি পূর্ণাঙ্গ এফটিএ হলে পণ্য ও সেবার বাজারে প্রবেশাধিকার আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতিতে বর্তমানে বাজার বহুমুখীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি প্রধান বাজারের ওপর রপ্তানি নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা চলছে। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এফটিএর উদ্যোগ সেই বৃহত্তর বাজার সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। শুল্ক সুবিধার পরিবর্তন হলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা প্রভাবিত হতে পারে। এ অবস্থায় দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে নতুন বাজারে সুবিধাজনক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ওয়েলিংটনের বৈঠকে তাই তিনটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কিতভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময়, আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ। এসব উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এসব প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে দীর্ঘ আলোচনা, নীতিগত সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে আরসিইপিতে সদস্যপদ অর্জনের ক্ষেত্রে চুক্তির উচ্চমানের বাণিজ্যিক শর্ত পূরণ এবং দেশীয় নীতি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয়ভাবে প্রস্তুত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে নিজেদের প্রস্তুতি ও সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে নিউজিল্যান্ডের সহযোগিতা চাওয়াকে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর আবেদন থেকে শুরু করে নতুন বাণিজ্য চুক্তি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই এখন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়েলিংটনের এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখন মূল লক্ষ্য হবে এলডিসি উত্তরণের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে নতুন বাজার ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করা।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com