প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল প্রাণকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক ও সর্বোচ্চ লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার এক বহুমুখী প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে এগিয়ে চলেছে। কোনো ধরনের বড় ধরনের আর্থিক বা অবকাঠামোগত নতুন বিনিয়োগ ছাড়াই আরব আমিরাতভিত্তিক খ্যাতনামা বন্দর ও লজিস্টিকস কোম্পানি দুবাই পোর্টস ওয়ার্ল্ড বা ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এই লাভজনক টার্মিনালটির পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব ও পরিচালনার ভার অর্পণের বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণের নানাবিধ প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে বর্তমান এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করার নেপথ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকারি সংস্থা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি কর্তৃপক্ষ। সরকারের এই নীতির ফলে দেশের কৌশলগত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখা গেছে যে, দেশের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থায়নেই নির্মিত হয়েছিল। এই টার্মিনালের মূল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণকাজেই কেবল প্রায় সাতান্ন কোটি টাকার ওপরে ব্যয় করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে টার্মিনালের অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার জন্য এর ব্যাকআপ সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম বা আধুনিক ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পেছনে বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। সবমিলিয়ে গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, এই এনসিটির পেছনে সরকারের মোট পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার সাত শ বারো কোটি টাকা। দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা এই অত্যন্ত লাভজনক ও স্বাবলম্বী টার্মিনালটি নিয়ে এখন নতুন করে নানা কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমীকরণ শুরু হয়েছে।

অভিজ্ঞ বন্দর বিশেষজ্ঞ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পরিকল্পনা ও প্রশাসন বিষয়ক সদস্য জাফর আলম সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তাঁর এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, আধুনিক সব প্রযুক্তিসম্পন্ন ও স্বয়ংক্রিয় এনসিটি টার্মিনালটি সফলভাবে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি ও লজিস্টিকস বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বহরেই পুরোপুরি বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এখানে শুধুমাত্র আধুনিক সফটওয়্যার ও আইটি ব্যবস্থার সামান্য আধুনিকায়ন করা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া ছাড়া নতুন করে কোনো ধরনের বড় বিনিয়োগের বা অর্থ খরচের কোনো সুযোগ বা অবকাশই নেই। অথচ পিপিপি কর্তৃপক্ষ তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর দাবি করে বলেছে যে, এই টার্মিনালটির আধুনিকায়নের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড নাকি নতুন করে আরও প্রায় বিশ কোটি পাঁচ লাখ ডলার বিনিয়োগ করবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল অঙ্কের কথিত বিনিয়োগের নির্দিষ্ট খাত বা উপখাতগুলোর বিষয়ে ওই ওয়েবসাইটে বা কোনো নথিতে সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ রাখা হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, এই পুরো প্রক্রিয়ার শেকড় প্রোথিত রয়েছে বিগত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক আগের সময়ে। পতিত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেনের বিরুদ্ধে দুবাইয়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে মানিলন্ডারিং করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। আরব আমিরাতের স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্তও শুরু করেছিল। সেই মানিলন্ডারিংয়ের তদন্ত প্রক্রিয়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম জড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হলে, সেই দেশের সরকারকে বিভিন্ন উপায়ে ম্যানেজ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তৎকালীন সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সময়ে কৌশলগত কূটকৌশলের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটিকে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তৎকালীন সময়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতা সালমান এফ রহমান পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তখনকার মুখ্য সচিব এম তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, পিপিপি অফিসের তৎকালীন সিইও ড. মোস্টফিকুর রহমান মিয়া এবং আরব আমিরাতের তখনকার রাষ্ট্রদূত আবু জাফর এই উদ্যোগকে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নেমেছিলেন।
গত ২০২৩ সালের বারো জুন অনুষ্ঠিত পিপিপি প্ল্যাটফর্মের এক উচ্চপর্যায় বৈঠকে পিপিপি অফিসের প্রধান নির্বাহী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব মোস্তফা কামালসহ অন্যান্য নীতিনির্ধারকরা এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর করার বিষয়টি চূড়ান্ত করেন এবং তা অফিশিয়াল মিটিং নোটসেও যুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের আমলেও এই বিদেশি কোম্পানির সেই বিতর্কিত প্রস্তাবটিকে বাতিল না করে বরং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তা বাস্তবায়নের কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চলমান এই সামগ্রিক চুক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান যে, এই চুক্তির প্রক্রিয়া তাঁর আমল থেকেই মূলত শুরু হয়েছিল। তবে শুরুতে প্রতিষ্ঠানটিকে কেবল একটি সাধারণ ‘অপারেটর’ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করার প্রাথমিক কথা ছিল। সেই প্রাথমিক শর্ত অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরকে নির্দিষ্ট কিছু সেবা প্রদানের বিনিময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করত— ঠিক যেভাবে অতীতে চিটাগং ড্রাইডক কিংবা সাইফ পাওয়ারটেককে বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে অত্যন্ত চতুরতার সাথে চুক্তির মূল কাঠামো সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে ওই বিদেশি প্রতিষ্ঠানটিকে সাধারণ অপারেটরের পরিবর্তে সরাসরি ‘কনসেশনিয়ার’ বা বিশেষ ইজারাদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে পুরো হিসাবের সমীকরণ সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। সাধারণ অপারেটর হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ যেখানে নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে কোম্পানিকে একটি নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করত, সেখানে কনসেশনিয়ার হিসেবে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে সরাসরি আদায় করা সমস্ত রাজস্ব বা অর্থ প্রথমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং হিসাব বছর শেষে সেই আয়ের একটি ছোট্ট নির্দিষ্ট শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রদান করা হবে। সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের মতে, এই অসম চুক্তির কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে বাধ্য হবে। কারণ একটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালে কেবল কনটেইনার ওঠানো-নামানো বা হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমেই আয় সীমিত থাকে না; এর বাইরেও স্টোরেজ রেন্ট বা গুদামজাতকরণের ভাড়া এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের বহুমুখী সেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাজস্ব অর্জিত হয়। নতুন এই কনসেশন চুক্তির আওতায় সেই সমস্ত আয়ের বিশাল একটি অংশ সোজা ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চলে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই বন্দরের প্রতি টিইইউ কনটেইনারে মোট আয় বর্তমান ১৬১.৮২ ডলার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ১২০ ডলারের কাছাকাছি এসে ঠেকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পেশ করা প্রস্তাব অনুসারে, বিশ ফুটের প্রতিটি কনটেইনারে গ্রস রেভিনিউ বা মোট আয় যদি ১২০ ডলার হয়, তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এর বিপরীতে পাবে মাত্র ৫৮.৫০ মার্কিন ডলার। এই নামমাত্র প্রাপ্ত টাকার মধ্য থেকেই আবার বন্দরকে বাধ্যতামূলকভাবে ৪১.৩২ ডলার পরিচালন ব্যয় হিসেবে মিটিয়ে দিতে হবে। এই অনিবার্য ব্যয়টুকু বাদ দিলে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিলে নিট মার্জিন হিসেবে টিকবে মাত্র ১৭.১৮ ডলার। অথচ বর্তমান ও প্রচলিত আর্থিক মডেলে যদি ১২০ ডলার আয় হয়, তবে সমস্ত পরিচালনা ও পরিবর্তনশীল খরচ বাদ দেওয়ার পরও বন্দর কর্তৃপক্ষের নিট মার্জিন থাকত প্রায় ৬৫.২৫ ডলার। অর্থাৎ এই নতুন চুক্তির কারণে বন্দর আর্থিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মুখে পড়বে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েও চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি বর্তমানে সমগ্র বন্দরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাভজনক ও দক্ষ টার্মিনাল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে মূলত চারটি প্রধান টার্মিনাল সচল রয়েছে, যার মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আকারের দিক থেকে জিসিবি দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি এবং অপারেশনাল দক্ষতার দিক থেকে এনসিটি সবকিছুর শীর্ষে অবস্থান করছে। জিসিবি টার্মিনালে জেটি রয়েছে মোট ছয়টি, যেখানে এনসিটিতে রয়েছে চারটি, সিসিটিতে দুটি এবং পিসিটিতে রয়েছে তিনটি জেটি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে জিসিবির ছয়টি জেটি ব্যবহার করে মোট ৪৬৫টি জাহাজ পরিচালনা করা হয়েছে। এর বিপরীতে মাত্র চারটি জেটি নিয়ে এনসিটি এক বছরে অবিশ্বাস্যভাবে ৭৮১টি জাহাজ সফলভাবে পরিচালনা করেছে। একই সময়ে সিসিটিতে মাত্র ২৩৮টি এবং পিসিটিতে ১২২টি জাহাজ নোঙর করতে সক্ষম হয়েছে। জিসিবির ছয়টি জেটি আলাদা ছয়টি ভিন্ন বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলেও এনসিটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড, যাদের সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক। বিগত অর্থবছরে এককভাবে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে দেশের সমস্ত টার্মিনালের মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছে এই এনসিটি। শুধু গত অর্থবছরই নয়, বরং ২০১৭ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিটা অর্থবছর ধরেই এই টার্মিনালটি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও শীর্ষ অবস্থান অবিচলভাবে ধরে রেখেছে। কাগজে-কলমে এই টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার ডিজাইনিং সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউ হলেও, এনসিটি কর্তৃপক্ষ সব সময়ই তাদের নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ কনটেইনার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সফলভাবে হ্যান্ডলিং করে আসছে।
কিন্তু এতসব অভাবনীয় সাফল্যের পরও দেশীয় দক্ষ ব্যবস্থাপনাকে পাশ কাটিয়ে বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মূলত পতিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মাফিয়ারা পুরো বন্দর খাতটিকে কুক্ষিগত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এঁকেছিল। শুধু এনসিটি একাই নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে সমগ্র চট্টগ্রাম বন্দরকেই বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির হাতে চিরতরে তুলে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্র করেছিল বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার। এই বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আড়ালে পর্দার অন্তরালে মূলত সক্রিয় রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন নামসর্বস্ব ও সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠান। তারা বিদেশি প্রধান অপারেটরদের লোকাল বা স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে নিজেদের নাম যুক্ত করে চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্ত লাভজনক টার্মিনালগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতের মুঠোয় নেওয়ার ভয়ংকর পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। এই সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের প্রথম এবং বড় শিকার হয়েছিল পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বা পিসিটি। চট্টগ্রাম বন্দরের জনগণের টাকায় সম্পূর্ণ ভৌত অবকাঠামো এবং জেটি নির্মাণ সম্পন্ন করার পর অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে পিসিটিকে বিনা বাক্যে তুলে দেওয়া হয়েছিল সৌদি আরবের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ের হাতে। এই রেড সি গেটওয়ের স্থানীয় ও এক্সক্লুসিভ এজেন্ট হিসেবে যুক্ত রয়েছে তৎকালীন স্বৈরশাসক শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ সম্পর্কের চাচাত ভাই শেখ হাফিজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএইচআর শিপিং।
একইভাবে পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত চতুরতার সাথে দেওয়া হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান মেডলগকে, যার মূল ব্যবসায়িক অংশীদার হলেন বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর নিজস্ব মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানি। অন্যদিকে, নির্মাণাধীন কৌশলগত লালদিয়ারচর কনটেইনার টার্মিনালের বাংলাদেশি অংশীদার হিসেবে রাখা হয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসের মালিককে, যিনি সরাসরি হাসিনার অত্যন্ত নিকটাত্মীয় এবং চিহ্নিত আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসার এবং বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার নাম করে বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর তুলে দেওয়ার কথা মুখে বলা হলেও, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে বন্দরের সমস্ত টার্মিনাল ও লাভজনক কার্যক্রমগুলো যেকোনো মূল্যে পতিত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট নির্দিষ্ট কিছু নেতার সিন্ডিকেটের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে থাকে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বৈরশাসনের পতনের পরও সেই একই চক্রের পাতা ফাঁদ এবং পুরোনো প্রক্রিয়াটি এখনো বিভিন্ন মহলের প্রভাবে অদৃশ্যভাবে চলমান রয়েছে, যা দেশের সচেতন ব্যবসায়ী সমাজ ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের চরমভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামানের বিভিন্ন বিতর্কিত বক্তব্য ও ভূমিকা নিয়েও বন্দর মহলে নানাবিধ সন্দেহ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এনসিটি টার্মিনালটিকে যেকোনো মূল্যে বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন সময় জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি একেক সময় সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ও ভিত্তিহীন বক্তব্য প্রদান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কিছুদিন আগে গণমাধ্যমের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর দাবি করেছিলেন যে, এনসিটির বর্তমান দৈনন্দিন অপারেশনে যেসব ভারী যন্ত্রপাতি ও ক্রেন ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগের নাকি কার্যকরী মেয়াদ ইতোমধ্যে ফুরিয়ে এসেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৭০ শতাংশ যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে এবং খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই অপারেশনাল সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। এই কল্পিত সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটার অজুহাত দেখিয়ে তিনি নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য এক লাফে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট এবং অন্তত তিন থেকে চার বছর দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন বলে জোরালো দাবি তোলেন।

তবে চট্টগ্রাম বন্দরেরই আরেক সাবেক সফল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বর্তমান চেয়ারম্যানের এই দাবির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে এর অসারতা প্রমাণ করেছেন। তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে জানান যে, এনসিটি টার্মিনালের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সমস্ত ভারী ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি তাঁর নিজের কার্যকালের মধ্যেই মাত্র তিন থেকে চার বছর আগে অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কেনা হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২২ সালের দিকে এই টার্মিনালটিতে একসঙ্গে অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির চারটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন বা কিউজিসি এবং চারটি রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেন বা আরটিজি সফলভাবে যুক্ত করা হয়েছিল। সবমিলিয়ে বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বিশাল অঙ্কের নিজস্ব অর্থে ১৪টি কিউজিসি এবং ৩৩টি আরটিজি ক্রেনসহ পৃথিবীর সর্বাধুনিক সমস্ত সরঞ্জাম চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের অর্থায়নে সংগ্রহ করেছে। এমনকি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বিশ্বমানের অত্যাধুনিক ‘টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম’ বা টিওএস অত্যন্ত সফলভাবে এবং নির্বিঘ্নে সচল রয়েছে। সম্প্রতি সংগৃহীত এই নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতির বেশিরভাগেরই প্রকৃত লাইফটাইম বা কর্মক্ষমতা এখনো বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অক্ষত রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি এই ভারী যন্ত্রপাতিগুলো নিয়মিত ও যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে, তবে অনায়াসেই আরও আগামী পনেরো থেকে বিশ বছর পর্যন্ত এগুলো কোনো রকম বড় সমস্যা ছাড়াই সচল রাখা সম্ভব। ফলে নতুন করে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা বিশাল অঙ্কের সরকারি অর্থ বিনিয়োগের যে কৃত্রিম গল্প শোনানো হচ্ছে, বাস্তবতার সাথে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবি করেন যে, পৃথিবীর ইতিহাসে এনসিটির মতো একটি সম্পূর্ণ সচল, আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ‘গ্রে টার্মিনাল’ বিদেশি কোম্পানির হাতে ইজারা বা লিজ দেওয়ার কোনো নজির কোথাও সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না।
এই সমস্ত বাস্তব চিত্র এবং কোনো নতুন বিনিয়োগের সুযোগ একেবারেই না থাকার পরও কেন হুট করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বিদেশি কোম্পানির হাতে এনসিটির মতো লাভজনক টার্মিনাল তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সঙ্গে। বর্তমান সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী এই কর্মকর্তা একই সঙ্গে পিপিপি কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেজা এবং মহেশখালী অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কাছে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রাখা হয়েছিল যে, যেখানে নতুন করে কোনো ধরনের আর্থিক বিনিয়োগের ন্যূনতম সুযোগ বা স্থানই নেই, সেখানে কোন যুক্তিতে এবং কীভাবে বিশ মিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে? আমার দেশ-এর এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে তিনি অত্যন্ত কৌশলী জবাব দিয়ে জানান যে, আন্তর্জাতিক বন্দর কার্যদক্ষতা সূচকে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান তিনশ ষাট ঘরের কাছাকাছি থাকার কারণে বৈশ্বিক রপ্তানি প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে অধিকতর সক্ষম ও অত্যন্ত অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক কোনো অপারেটর দিয়ে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করার উদ্যোগটি মূলত একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। তবে তিনি সঙ্গে এও স্পষ্ট করে স্বীকার করেছেন যে, এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি এখনো মূলত আলোচনা ও পর্যালোচনার প্রাথমিক ও অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা পর্যন্ত টার্মিনালের এই বিশাল বিনিয়োগ, জটিল আর্থিক কাঠামো কিংবা বিদেশি অপারেটর নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তিনি আশ্বস্ত করে জানান যে, যখনই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সংবাদ মাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেবে।
এদিকে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অনুমোদিত বা গোপন স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করা ‘ফারহান লজিস্টিক’ নামক একটি রহস্যজনক প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হান্নানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত সংক্ষেপে জানান যে, তারা সবেমাত্র ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছেন এবং এই মুহূর্তে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রদান করার মতো কোনো পরিস্থিতি তাদের নেই। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত কৌশলগত টার্মিনালকে কোনো ধরনের দেশীয় স্বার্থ বা সুনির্দিষ্ট স্বচ্ছতা ছাড়াই নামসর্বস্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে সঁপে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে আজ দেশের অর্থনীতিবিদ, বন্দর বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিকদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে বন্দরের নিজস্ব সক্ষমতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে দেশীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এই লাভজনক টার্মিনালটি পরিচালনা করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট সকলেই জোরালো অভিমত ব্যক্ত করছেন।