প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, খরা ও বৃষ্টির ঘাটতিতে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী দানিউবের পানির স্তর ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রোমানিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। পর্যাপ্ত শীতলীকরণ পানি না পাওয়ায় দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চেরনাভোদার দুই চুল্লিই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ে দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা এই কেন্দ্রটি আপাতত জাতীয় গ্রিডে কোনো বিদ্যুৎ দিতে পারছে না।
চেরনাভোদা কেন্দ্রের দ্বিতীয় চুল্লি বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুরের কিছু আগে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ৭০৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই ইউনিটটি বন্ধ করার আগে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ নদীর পানির প্রবাহ বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু দানিউবের পানির স্তর ক্রমাগত কমতে থাকায় শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রটি বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো নিরাপদ পথ থাকেনি।
এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকে একই কেন্দ্রের প্রথম চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় চুল্লিটিও বন্ধ হওয়ার পর রোমানিয়ার পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি থেমে যায়। কেন্দ্রটির পরিচালক রোমিও উরজান জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী ১০ দিনের মধ্যে কেন্দ্রটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে দেশটিকে অন্তত স্বল্পমেয়াদে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে।
চেরনাভোদা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রোমানিয়ার জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দুটি চুল্লি মিলিয়ে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪১২ মেগাওয়াট। সাধারণ সময়ে এই কেন্দ্র দেশের প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তাই দুই ইউনিট একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গরমের এই সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
পারমাণবিক চুল্লির কার্যক্রম নিরাপদ রাখতে শীতলীকরণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চেরনাভোদা কেন্দ্রের শীতলীকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে দানিউব নদীর পানি সরাসরি যুক্ত। কিন্তু এবারের দীর্ঘ তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় নদীর প্রবাহ এতটাই কমেছে যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে নদীর পানির উচ্চ তাপমাত্রা ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিহীনতা।
কেন্দ্রটি বন্ধ করার আগে রোমানিয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কিছু অস্বাভাবিক ব্যবস্থা নেয়। দানিউবের নির্দিষ্ট অংশে পানির প্রবাহ বাড়ানোর জন্য পাথরবোঝাই বার্জ ডুবিয়ে দেওয়া হয়। নদীর গতিপথে পরিবর্তন এনে কেন্দ্রের কাছাকাছি পানির স্তর কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টাও করা হয়। এর আগে নদীর তলদেশে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পানি প্রবাহের পথ প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কিন্তু এসব প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার স্বার্থে দ্বিতীয় চুল্লিটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
চেরনাভোদা কেন্দ্রের ইতিহাসে পুরো স্থাপনা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিরল। এর আগে ২০০৩ সালে গুরুতর খরার সময় কেন্দ্রটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছিল। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবারও প্রকৃতির বিরূপ পরিস্থিতির কারণে একই ধরনের ঘটনা ঘটল। তবে এবারের পরিস্থিতিকে শুধু সাময়িক পানি সংকট হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘ খরা যে অবকাঠামোগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, চেরনাভোদার ঘটনা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই ঘাটতি পূরণে রোমানিয়া সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো পর্যাপ্ত থাকায় সৌরবিদ্যুৎ কিছুটা সহায়তা করতে পারে। বাতাসের গতি অনুকূলে থাকলে বায়ু বিদ্যুৎও জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত সরবরাহ দিতে পারবে। কিন্তু সন্ধ্যার পর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত কমে যায়। অথচ গরমের কারণে ওই সময় ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই ঘাটতি মোকাবিলায় কয়লা ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রয়োজনও তৈরি হয়েছে। সরকার নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বিশেষ করে সন্ধ্যার সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
রোমানিয়ার জন্য সমস্যা আরও জটিল হয়েছে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায়। দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জলবিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যে খরা ও বৃষ্টির ঘাটতি দানিউবের পানির স্তর কমিয়েছে, একই কারণে অন্যান্য নদী ও জলাধারেও পানির পরিমাণ কমে গেছে। ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও স্বাভাবিক মাত্রায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থাৎ একই প্রাকৃতিক সংকট রোমানিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একাধিক স্তরে আঘাত করছে। একদিকে পারমাণবিক কেন্দ্র শীতলীকরণ পানির সংকটে বন্ধ, অন্যদিকে নদী ও জলাধারে পানি কমে যাওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত। এর সঙ্গে তীব্র গরমে মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। ফলে সরবরাহ কমার বিপরীতে চাহিদা বাড়ার একটি কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব রোমানিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রতিবেশী মলদোভা বিদ্যুতের একটি বড় অংশের জন্য রোমানিয়ার ওপর নির্ভর করে। রোমানিয়ার নিজস্ব উৎপাদন কমে গেলে মলদোভাকেও বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করতে হতে পারে। এতে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের দামেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দানিউবের পানির সংকটের প্রভাব প্রতিবেশী হাঙ্গেরিতেও দেখা যাচ্ছে। দেশটির পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও শীতলীকরণের জন্য দানিউবের পানি ব্যবহার করে। পানির স্তর রেকর্ড পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নদীর পানির স্তর কিছুটা বাড়ায় কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হওয়া এড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবু দীর্ঘস্থায়ী খরা আবার পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলতে পারে।
পাকস কেন্দ্র হাঙ্গেরির বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রোমানিয়ার অভিজ্ঞতা হাঙ্গেরির জন্যও বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। একই নদীর ওপর নির্ভরশীল দুটি দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি একই সময়ে পানির সংকটে পড়ে, তাহলে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
দানিউবের পানি কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এই নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহন, কৃষিকাজ, শিল্প এবং নদীনির্ভর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে রাইন নদীতেও। পানির স্তর কমে যাওয়ায় পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল সীমিত হচ্ছে এবং ইউরোপের সরবরাহব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইউরোপে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘ খরা, পানির সংকট এবং দাবানল এখন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে। ইউরোপের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মহাদেশটি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন তাপপ্রবাহ এবং পানির সংকট দেখা দিতে পারে।
এই তাপপ্রবাহের প্রভাব ইউরোপের কৃষি খাতেও পড়ছে। ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সেচের পানির সংকট বাড়ছে এবং অতিরিক্ত গরমে কৃষিজমির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সময়ে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে। গ্রিস, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরমের পাশাপাশি দাবানলের ঘটনাও ঘটছে। ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে পর্যটন, কৃষি ও অবকাঠামো—সবখাতেই চাপ বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যেও এবারের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। লন্ডনের কিউ গার্ডেনে ৩৮ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা এ বছরের দেশটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্রিসে দাবানলের কারণে পর্যটন এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, ইউরোপের বর্তমান তাপপ্রবাহ কেবল আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা নয়; এটি অবকাঠামো ও জনজীবনের ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করছে।
রোমানিয়ার চেরনাভোদা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘটনা সেই বড় সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও যখন নদীর পানির স্তরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা সামনে আসে। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ অবকাঠামো পরিকল্পনায় তাই শুধু উৎপাদন ক্ষমতা নয়, পানি, তাপমাত্রা, খরা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
রোমানিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং একই সঙ্গে চেরনাভোদা কেন্দ্রের নিরাপদ পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির প্রবাহ স্বাভাবিক না হলে দ্রুত কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব নাও হতে পারে। এর মধ্যে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি এবং সাশ্রয়ী ব্যবহারের মাধ্যমে ঘাটতি সামাল দেওয়াই হবে সরকারের প্রধান কাজ।
সবচেয়ে বড় বার্তাটি অবশ্য আরও গভীর। দানিউবের শুকিয়ে যাওয়া নদীতল যেন ইউরোপকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তাপমাত্রার রেকর্ডে আটকে নেই। এর প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি থেকে মানুষের ঘরের আলো পর্যন্ত, কৃষকের জমি থেকে নদীপথের বাণিজ্য পর্যন্ত। রোমানিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের এই অস্বাভাবিক বন্ধ তাই একটি দেশের বিদ্যুৎ সংকটের খবরের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকিরও এক শক্তিশালী সতর্কসংকেত।