প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় এ দিনে ইবাদত-বন্দেগি, জিকির, দোয়া ও কোরআন তিলাওয়াতের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্যস্ত জীবনের নানা চাপ, দুশ্চিন্তা ও পার্থিব ব্যস্ততার মধ্যে জুমার দিন একজন মুমিনের জন্য নিজের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
মানুষের হৃদয় সময়ের সঙ্গে নানা কারণে ভারী হয়ে যায়। দুশ্চিন্তা, অহংকার, অতিরিক্ত দুনিয়ামুখিতা, গুনাহ এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকা অন্তরের প্রশান্তিকে নষ্ট করতে পারে। কোরআনের তিলাওয়াত সেই অন্তরকে আবার আল্লাহর স্মরণের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ সুরা রাদের এই বাণী মুমিনের জীবনে জিকির ও আল্লাহর কালামের গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কোরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নাজিল হয়নি; এটি মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল করা হেদায়াতের কিতাব। তাই জুমার দিনে কোরআন পড়ার পাশাপাশি এর অর্থ বোঝা, আয়াতের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করা এবং নিজের জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুঁজে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
মুমিনের অন্তরে গুনাহ ও গাফেলতার যে প্রভাব পড়ে, ইসলামী শিক্ষায় সেটিকে অন্তরের মরিচার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বর্ণনায় অন্তরে মরিচা ধরার কথা এসেছে এবং তা দূর করার উপায় হিসেবে মৃত্যু স্মরণ ও কোরআন তিলাওয়াতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নিয়মিত কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক মানুষের আত্মিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
জুমার দিনের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুরা কাহফ বিশেষভাবে আলোচিত। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত নূর আলোকিত থাকবে। এ কারণে বহু মুসলমান জুমার দিন সুরা কাহফ তিলাওয়াতকে নিয়মিত আমল হিসেবে গ্রহণ করেন।
জুমার সময়সীমা নিয়েও ইসলামী ফিকহে আলোচনা রয়েছে। প্রচলিত ফিকহি ব্যাখ্যা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে জুমার দিনের সময়ের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। ফলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকেই সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা সম্ভব। এতে শুক্রবারের ব্যস্ততার কারণে যারা দিনের বেলায় সময় বের করতে পারেন না, তারাও আগের সন্ধ্যায় এ আমলটি সম্পন্ন করতে পারেন।
সুরা কাহফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার সঙ্গে এর সম্পর্ক। সহিহ মুসলিমে হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি সুরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবে। অন্য একটি বর্ণনায় শেষ দশ আয়াতের কথাও এসেছে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী সুরা কাহফের প্রথম ও শেষ দশ আয়াত মুখস্থ করার পাশাপাশি সেগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা একজন মুসলমানের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে শুধু কতবার পড়া হলো বা কত দ্রুত শেষ করা হলো—এটিই মূল বিষয় নয়। কোরআনের শব্দগুলো শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা, মনোযোগের সঙ্গে পড়া এবং আয়াতের অর্থ নিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন তিলাওয়াত যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন মানুষের চিন্তা, আচরণ ও জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে—সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
কোরআন দেখে পড়া কিংবা মুখস্থ পড়া—দুইভাবেই তিলাওয়াত করা যায়। তবে কোরআন দেখে পড়ার ফজিলত নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন অতিরঞ্জিত বক্তব্যকে যাচাই ছাড়া সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। বরং নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব বোঝা এবং শুদ্ধভাবে আমল করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো এর অর্থ ও ব্যাখ্যা পড়া। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা নাজিল করা হয়েছে যাতে মানুষ এর আয়াত নিয়ে চিন্তা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে। অর্থাৎ কোরআনের তিলাওয়াতের পাশাপাশি তাদাব্বুর বা গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জুমার দিন তাই কেউ চাইলে নিজের জন্য একটি সহজ আধ্যাত্মিক রুটিন তৈরি করতে পারেন। বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর সুরা কাহফ তিলাওয়াত দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। শুক্রবার ফজরের পর কিছু সময় কোরআন পড়া, তিলাওয়াত করা আয়াতের বাংলা অর্থ বোঝা এবং সুযোগ থাকলে নির্ভরযোগ্য তাফসির পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। জুমার নামাজের আগে দরুদ, জিকির ও দোয়ায় সময় দেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিলাওয়াতের সময় তাড়াহুড়া না করে মনোযোগ ও শুদ্ধতার দিকে নজর দেওয়া।
জুমার দিনকে শুধু একটি নির্দিষ্ট নামাজের দিন হিসেবে দেখলে এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের বড় একটি অংশ অনুধাবন করা হয় না। এটি একজন মুমিনের জন্য নিজের ঈমান ও আমল পর্যালোচনা করার সুযোগও হতে পারে। সপ্তাহজুড়ে কাজ, পরিবার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা পার্থিব ব্যস্ততার মধ্যে যে সময়টি আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে কেটে যায়, জুমার দিন সেই সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার উপলক্ষ হতে পারে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা ধরনের বিনোদনের প্রভাব অনেক বেশি। দিনের বড় একটি অংশ অনলাইনে ব্যস্ত থাকার কারণে অনেকেই কোরআন পড়া বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারেন না। জুমার দিনে অন্তত কিছু সময় এসব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে আল্লাহর কালামের জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তবে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু শুক্রবারে সীমাবদ্ধ না রাখাই উত্তম। জুমার দিন নতুন করে যে অভ্যাস শুরু করা হবে, তা যেন সপ্তাহের অন্যান্য দিনেও অব্যাহত থাকে। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা ও আয়াতের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে।
কোরআনের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের চরিত্র ও আচরণে প্রকাশ পাওয়ার কথা। তাই কোরআন পড়ার পর যদি মানুষের কথাবার্তায় সত্যবাদিতা, আচরণে নম্রতা, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ বাড়ে, তবেই সেই তিলাওয়াত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে বলা যায়। শুধু কণ্ঠে আয়াত উচ্চারণ নয়, কোরআনের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে জীবন পরিচালনার চেষ্টাই হওয়া উচিত একজন মুমিনের লক্ষ্য।
জুমার দিনে কোরআনের তিলাওয়াত তাই শুধু একটি আমল নয়; এটি নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানোর একটি সুযোগ। দুনিয়ার ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় আল্লাহর কালামের জন্য রেখে দিলে মন শান্ত হতে পারে, চিন্তা পরিষ্কার হতে পারে এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই জুমায় তাই কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করা যেতে পারে। সুরা কাহফ তিলাওয়াতের পাশাপাশি কোরআনের অর্থ বোঝা, নিজের ভুল ও গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার সংকল্প করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের কোরআন তিলাওয়াত, কোরআন বোঝা এবং কোরআনের আলোয় জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।