প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের উপকূলে শক্তিশালী ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত দুজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের পর উপকূলীয় এলাকায় সুনামির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের সৈকত ও নদীর তীর থেকে দূরে সরে গিয়ে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের এন্ডে শহর থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার। অগভীর গভীরতায় এত শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ায় এর কম্পন বিস্তৃত এলাকায় অনুভূত হয় এবং ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
ভূমিকম্পের পরপরই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে দ্রুত বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে বেশ কিছু ভবন ও স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে মাউমেরে বন্দর ও আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্পের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিএনপিবি জানিয়েছে, মাউমেরে বন্দরে ভূমিকম্পের ঘটনায় একজন পুরুষ ও একজন নারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য সংগ্রহ করছে।
প্রাথমিক কম্পনের প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে অন্তত তিনটি শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়। এগুলোর মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯, ৫ দশমিক ৬ এবং ৬ দশমিক ১। পরপর শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় প্রশাসনকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে সম্ভাব্য সুনামি। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিদ্যা সংস্থা বিএমকেজি ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করে। সংস্থাটি উপকূলের কাছাকাছি থাকা মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে সৈকত ও নদীর তীর থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কারণ শক্তিশালী সামুদ্রিক ভূমিকম্পের পর শুধু সমুদ্রের তীরেই নয়, নদীর মোহনা ও নদীপথেও পানির অস্বাভাবিক প্রবাহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। দেশটির বিস্তৃত দ্বীপপুঞ্জের অনেক অঞ্চল সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের ওপর অবস্থান করছে। ফলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সঙ্গে সুনামির ঝুঁকিও ইন্দোনেশিয়ার জন্য দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
ফ্লোরেস দ্বীপ ও পূর্ব নুসা তেঙ্গারা অঞ্চলও ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে পড়ে। এ অঞ্চলের উপকূলীয় জনবসতি, বন্দর, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় বিশেষ ঝুঁকির মুখে পড়ে। শনিবারের ভূমিকম্পের পর মাউমেরে এলাকায় বন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের ফুটেজে দেখা যায়, ভূমিকম্পের প্রভাবে কিছু ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। তবে পুরো অঞ্চলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রত্যন্ত দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও সময় লাগতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত পৌঁছানো এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভূমিকম্পের পর আফটারশক চলতে থাকায় উদ্ধারকাজের সময়ও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশের আগে সেটি নিরাপদ কি না, তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভূমিকম্পের ঘটনায় প্রাণহানির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। যেসব পরিবার উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে, তাদের অনেকেই সুনামি সতর্কতার কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া নিয়েও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই প্রথম কম্পনের পর বিপদ কেটে গেছে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। পরবর্তী আফটারশক কিংবা সমুদ্রের পানির অস্বাভাবিক আচরণের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া জরুরি।
শনিবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ৭ দশমিক ৭ হওয়ায় এটি একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাত্রার পাশাপাশি ভূমিকম্পের গভীরতাও ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরতায় ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হওয়ায় ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এলাকায় এর কম্পনের প্রভাব তুলনামূলক বেশি অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
মাউমেরে ও আশপাশের এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা এবং ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে। নিহতদের পরিবার ও আহত ব্যক্তির প্রতি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও জরুরি সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সুনামি সতর্কতার কারণে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় এলাকায় সাধারণত ভূমিকম্পের পর মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সতর্কতা প্রত্যাহারের অপেক্ষা করতে বলা হয়। সমুদ্রের পানির আচরণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি ফিরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায় অতীতেও শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামির কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। তাই দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ভূমিকম্পের পর দ্রুত সতর্কতা জারি এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
শনিবারের ঘটনায়ও দ্রুত সুনামি সতর্কতা জারি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ভূমিকম্পের পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং নতুন কোনো কম্পন বা সুনামির সংকেত দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিকভাবে দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলেও উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। দুর্গম এলাকা থেকে নতুন তথ্য আসার পর পরিস্থিতির আরও পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে প্রস্তুতি ও দ্রুত সতর্কতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে জরুরি সাড়া দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা এবং নিরাপদ স্থানে দ্রুত সরে যাওয়ার সক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখে। আপাতত ফ্লোরেস দ্বীপের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো সতর্ক থাকা, উপকূল ও নদীর তীর এড়িয়ে চলা এবং কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা মেনে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করা।