সুদানে আরএসএফের হামলায় নিহত ১৪, বাড়ছে মানবিক সংকট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
সুদানে আরএসএফের হামলায় নিহত ১৪, বাড়ছে মানবিক সংকট

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুদানের সংঘাতপ্রবণ কর্ডোফান অঞ্চলে আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফের হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন মানুষ। স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এল ওবেইদের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত উম্ম আরদা এলাকায় শুক্রবার এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পর ওই এলাকার বহু বেসামরিক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন ইমার্জেন্সি লইয়ার্স হামলার জন্য আরএসএফকে দায়ী করেছে। সংগঠনটির ভাষ্য, উম্ম আরদা এলাকায় হামলায় ১৪ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। সংঘাতের কারণে এলাকাটিতে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যু মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকটও তীব্র হচ্ছে।

এর আগে শুক্রবার আরএসএফ দাবি করেছিল, তারা কর্ডোফান অঞ্চলের উম্ম আরদা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বাহিনীটি এই ঘটনাকে যুদ্ধের মাঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করে। তবে তাদের দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংঘাতপূর্ণ এলাকাটিতে সাংবাদিক ও মানবিক সংস্থাগুলোর প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সুদানের সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, উম্ম আরদা এবং জাবাল আল-হাশাবা এলাকায় আরএসএফের দুটি হামলা প্রতিহত করেছে সেনাবাহিনী। তার দাবি, এসব সংঘর্ষে আরএসএফের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর এই দাবি সম্পর্কেও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

উম্ম আরদা ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক লড়াই সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধের আরও একটি ভয়াবহ দিক সামনে এনেছে। সামরিক বাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘর্ষে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শহর ও গ্রামগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই যত তীব্র হচ্ছে, ততই বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ছে।

ইমার্জেন্সি লইয়ার্স জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে আগে থেকেই অবরোধ ও মৌলিক সেবার ঘাটতিতে থাকা এলাকাগুলোর মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। কোথাও কোথাও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। ফলে সংঘর্ষের সরাসরি শিকার হওয়ার পাশাপাশি খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার অভাবেও মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বিশেষ করে শিশুদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শিশু অধিকার সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন শুক্রবার জানিয়েছে, উত্তর কর্ডোফানে চলমান সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে প্রায় ৪০ হাজার শিশু এল ওবেইদ শহরে আশ্রয় নিয়েছে। যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এসব শিশুর বড় একটি অংশ এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য পরিচালিত শিবিরগুলোতে অবস্থান করছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্য অনুযায়ী, এল ওবেইদের দুটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির ঘটনা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে সেখানে তীব্র খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে। সংঘাতের কারণে পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবন ভেঙে পড়ায় শিশুদের প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু পরিবারকে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় শুধু পানি সংগ্রহের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে পানি সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করা এবং দূরবর্তী স্থান থেকে পানি নিয়ে আসা পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সুদানে চলমান যুদ্ধ ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। চতুর্থ বছরে গড়ানো এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধের কারণে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য সরবরাহ ও অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত শিবির বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন।

সুদানের সামরিক বাহিনী এবং আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকেই ২০২৩ সালে এই যুদ্ধ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সংঘাত রাজধানী খার্তুম ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে দারফুর, কর্ডোফানসহ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় লড়াই তীব্র হয়েছে। এর ফলে বহু শহর ও গ্রামে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

বর্তমানে সুদানের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমের দারফুর অঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের কিছু অংশ আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে নিয়মিত সংঘর্ষ চলছে। এর মধ্যে কর্ডোফান অঞ্চল সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ অঞ্চলটি দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ ও সামরিক চলাচলের ক্ষেত্রে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।

উম্ম আরদায় আরএসএফের হামলা এবং শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি এই বৃহত্তর সামরিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে সংঘর্ষের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হওয়ায় কোন পক্ষ কতটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে বা যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি কত, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের মূল বিষয় এখন বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা। সংঘর্ষ চলতে থাকলে আরও মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন এবং খাদ্য ও পানির ওপর চাপ বাড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে মানবিক সংস্থাগুলো অনেক এলাকায় নিয়মিত সহায়তা পৌঁছে দিতে পারছে না। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা মানুষও প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি মানবিক সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের অপুষ্টি ও রোগব্যাধি ঠেকাতে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

উম্ম আরদার সাম্প্রতিক হামলা তাই শুধু একটি স্থানীয় সংঘর্ষের ঘটনা নয়; এটি সুদানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রতিদিন আরও অনিশ্চিত করে তুলছে, তারই আরেকটি উদাহরণ। ঘরবাড়ি হারানো পরিবার, ক্ষুধার্ত শিশু এবং পানির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা মানুষের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দেশটির মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। সংঘাতের অবসান এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি না হলে এই সংকটের পরিধি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত