ফ্রান্সে সাইবার হামলা, লাখ লাখ মানুষের তথ্য চুরি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
ফ্রান্সে সাইবার হামলা, লাখ লাখ মানুষের তথ্য চুরি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফ্রান্সের সরকারি কম্পিউটার ব্যবস্থায় ধারাবাহিক সাইবার হামলার ঘটনায় লাখ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি হয়েছে। দেশটির কর বিভাগ ও ভূমি নিবন্ধন দপ্তরের সিস্টেমে জুন ও জুলাই মাসে পৃথক দুটি হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত, আয় ও করসংক্রান্ত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশটির সরকারি তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফ্রান্সের পাবলিক ফাইন্যান্সের মহাপরিদপ্তর ডিজিএফআইপি শুক্রবার জানায়, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে তাদের কম্পিউটার ব্যবস্থায় দুটি পৃথক সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রথম হামলাটি জুন মাসে এবং দ্বিতীয়টি জুলাইয়ে সংঘটিত হয়। কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, দুটি হামলাতেই সরকারি সংরক্ষণাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ তথ্য অননুমোদিতভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। এরই মধ্যে একটি হ্যাকার গোষ্ঠী এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে।

জুনের হামলাটি ছিল বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ডিজিএফআইপির তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ৬ লাখ ৭৮ হাজার ব্যক্তি ও পেশাজীবী অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে থাকা নাগরিকদের নাম, আয়ের হিসাবসংক্রান্ত তথ্য এবং তারা কী পরিমাণ কর পরিশোধ করেছেন, সেই সংক্রান্ত তথ্যও ছিল। অর্থাৎ হামলাটি শুধু সাধারণ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; নাগরিকদের আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ সরকারি কর ব্যবস্থায় সংরক্ষিত তথ্যের একটি বড় অংশ নাগরিকদের আর্থিক পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে ভবিষ্যতে পরিচয় জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত এসব তথ্য ব্যবহার করে বড় ধরনের নতুন প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয় ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাকে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই হামলায় প্রায় ২ লাখ ভূমি নিবন্ধন অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি হয়েছে। ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্যের গুরুত্বও কম নয়। কারণ এসব নথির সঙ্গে বাড়ি, জমি ও অন্যান্য সম্পত্তির মালিকানা সম্পর্কিত তথ্য যুক্ত থাকে। ফলে এ ধরনের তথ্য ফাঁস হলে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নয়, সম্পত্তি-সংক্রান্ত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

এরই মধ্যে ‘জিরোবাইটস’ নামে একটি হ্যাকার গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা দ্বিতীয় হামলার মাধ্যমে ২ লাখ ৫০ হাজার ভূমি নিবন্ধন অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে। গোষ্ঠীটির দাবি, এসব অ্যাকাউন্টের সঙ্গে জমি ও সম্পত্তির মালিক প্রায় ২০ লাখ মানুষের তথ্য জড়িত। তবে হ্যাকারদের দেওয়া এই সংখ্যার সবটুকু স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে চুরি হওয়া তথ্যের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে সরকারি হিসাব এবং হ্যাকার গোষ্ঠীর দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

জিরোবাইটস একটি ডার্ক ওয়েব ফোরামে হামলার দায় স্বীকার করেছে। ফরাসি সরকারি কম্পিউটার ব্যবস্থায় এর আগে সংঘটিত কয়েকটি সাইবার হামলার সঙ্গেও গোষ্ঠীটির নাম জড়িয়েছে। গোষ্ঠীটি আরও দাবি করেছে, তারা ফরাসি কর কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত একটি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএনে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল। তবে কীভাবে তারা ওই ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে এবং কত সময় ধরে সরকারি সিস্টেমে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সাইবার অপরাধীদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। একটি সরকারি ডাটাবেজে একই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের পরিচয়, আয়, কর, সম্পত্তি কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক তথ্য থাকতে পারে। ফলে এসব ব্যবস্থায় নিরাপত্তার সামান্য দুর্বলতাও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একের পর এক বড় সাইবার হামলার ঘটনা ঘটায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর আগে এপ্রিল মাসে পরিচয়পত্রের আবেদন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এএনটিএস নামের সরকারি সংস্থায় বড় ধরনের সাইবার হামলা হয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যক্তি ও পেশাজীবীর তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। পরিচয়পত্রসংক্রান্ত সরকারি তথ্যের এমন ব্যাপক ক্ষতি ফ্রান্সের সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছিল।

এ ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রান্সের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তাদের কম্পিউটার ব্যবস্থায় বড় ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় প্রায় ১২ লাখ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি হওয়ার কথা জানানো হয়। একের পর এক সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন হামলার ঘটনায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সরকারি সেবার বড় একটি অংশ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। কর পরিশোধ থেকে শুরু করে সম্পত্তি নিবন্ধন, পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সরকারি ও বেসরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে নাগরিকদের সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হলেও একই সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। একটি সফল হামলা মুহূর্তের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের তথ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ঝুঁকিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে কর ও সম্পত্তির তথ্য চুরির ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। কারণ একজন ব্যক্তির নাম, আয়, করের পরিমাণ ও সম্পত্তির তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণামূলক বার্তা বা যোগাযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে আরও সংবেদনশীল তথ্য বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব।

তবে এখন পর্যন্ত ফরাসি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এমন কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি যে চুরি হওয়া সব তথ্য ইতোমধ্যে অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে এবং হামলার প্রকৃতি, ক্ষতির পরিমাণ ও তথ্য চুরির পদ্ধতি সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।

বিশ্বজুড়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন ফ্রান্সের এই ঘটনা সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে। শুধু প্রযুক্তিগত সুরক্ষা জোরদার করাই নয়, সরকারি কর্মীদের ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক, ভিপিএন, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরকে আরও কঠোরভাবে সুরক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

লাখ লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য একবার সাইবার অপরাধীদের হাতে চলে গেলে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই হামলার পর তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। একের পর এক হামলার পর দেশটির সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত