পারমাণবিক আইসব্রেকারে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উত্তর মেরু জয়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
পারমাণবিক আইসব্রেকারে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উত্তর মেরু জয়

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বরফে ঢাকা উত্তর মেরুর পথে রাশিয়ার পারমাণবিকচালিত আইসব্রেকারে চড়ে এক অনন্য বৈজ্ঞানিক অভিযানের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে বাংলাদেশের এক কিশোর শিক্ষার্থী। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মালেকুল সালেহীন প্রত্যয় রাশিয়ার পারমাণবিক আইসব্রেকার ‘৫০ লিয়েত পাবেদি’তে চড়ে উত্তর মেরু অভিযান সম্পন্ন করেছে। বিশ্বের ২২টি দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই অভিযানে অংশ নিয়ে প্রত্যয় শুধু বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বই করেনি, বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অনুসন্ধিৎসার এক আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রসাটমের আয়োজনে ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ কর্মসূচির সপ্তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক অভিযানের অংশ হিসেবে এই যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ১০ দিনের অভিযানে শিক্ষার্থীদের দলটি রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর মুরমানস্ক থেকে যাত্রা শুরু করে উত্তর মেরুর দিকে এগিয়ে যায়। এরপর ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ড হয়ে আবার মুরমানস্কে ফিরে আসে তারা। বরফে ঘেরা দুর্গম অঞ্চলে এমন অভিযান অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন ছিল রোমাঞ্চকর, তেমনি ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিজ্ঞান শেখার এক বিরল সুযোগ।

উত্তর মেরু পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম ও প্রতিকূল অঞ্চল। বছরের বড় একটি সময় সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকা বরফে ঢাকা থাকে এবং আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। এমন পরিবেশে একটি পারমাণবিকচালিত আইসব্রেকারে যাত্রা সাধারণ কোনো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নয়। বরং এটি ছিল বিজ্ঞান, প্রকৃতি, প্রযুক্তি ও মানব অনুসন্ধিৎসার সমন্বিত এক শিক্ষামূলক অভিযান। সেই অভিযানে কিশোর বয়সেই অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশের প্রত্যয়।

অভিযান চলাকালে শিক্ষার্থীরা সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান, পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সরাসরি শেখার সুযোগ পায়। শ্রেণিকক্ষের প্রচলিত শিক্ষার বাইরে বাস্তব পরিবেশে বিজ্ঞানকে দেখার এই সুযোগ তাদের শেখার অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রকৃতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।

অভিযানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ছিল রেডিওসন্ডে উৎক্ষেপণ। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের তাপমাত্রা, চাপ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহে এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীরা এ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণের বাস্তব প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। পাশাপাশি স্ট্র্যাটোস্ফেরিক প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষাসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমেও তারা যুক্ত ছিল। ফলে পুরো অভিযানটি শুধু উত্তর মেরু ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি চলমান বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারের মতো অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

এই অভিযানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৬ বছর। অর্থাৎ প্রত্যয়ের মতো কিশোর শিক্ষার্থীদের জন্য এমন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে বিশেষ অর্জন। এত অল্প বয়সে পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তাদের শিক্ষা ও গবেষণার আগ্রহকে আরও গভীর করতে পারে।

প্রত্যয়ের আগের অর্জনও তার বৈজ্ঞানিক ও সৃজনশীল আগ্রহের পরিচয় বহন করে। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান প্রতিযোগিতা, কুইন্স কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক ইয়ুথ ম্যাথ চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অলিম্পিয়াডে সে সাফল্য অর্জন করেছে। বিজ্ঞান ও গণিতের পাশাপাশি লেখালেখি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রেও তার আগ্রহ রয়েছে। ফলে ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণকে তার আগের সাফল্যের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যায়।

রসাটমের তথ্য অনুযায়ী, ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ কর্মসূচির সাতটি মৌসুমে বিভিন্ন দেশের ৪৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আর্কটিক ও উত্তর মেরু ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছে। তরুণদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করাই এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একই অভিযানে অংশ নেওয়ায় তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হয়।

এবারের অভিযানে বাংলাদেশের প্রত্যয়ের অংশগ্রহণ তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়, বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সক্ষমতারও একটি দৃষ্টান্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে প্রত্যয় বাংলাদেশের শিক্ষা ও তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাশিয়ার পারমাণবিকচালিত আইসব্রেকার ‘৫০ লিয়েত পাবেদি’। বিশাল বরফস্তর ভেঙে আর্কটিক অঞ্চলের দুর্গম পথে চলাচলের জন্য এ ধরনের জাহাজ বিশেষভাবে নির্মিত। রসাটমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়াই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যার কাছে পারমাণবিকচালিত আইসব্রেকারের বহর রয়েছে। এই জাহাজের মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে দীর্ঘ ও কঠিন সমুদ্রপথ অতিক্রম করা সম্ভব হয়।

একজন কিশোর শিক্ষার্থীর কাছে এমন জাহাজে চড়ে উত্তর মেরুতে যাত্রা নিঃসন্দেহে জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকার কথা। বরফের বিশাল প্রান্তর, মেরু অঞ্চলের পরিবেশ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিচালিত জাহাজের কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার সুযোগও পেয়েছে অংশগ্রহণকারীরা। বিজ্ঞানকে শুধু বইয়ের পাতায় না রেখে বাস্তব জগতের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিজ্ঞতার গুরুত্ব রয়েছে।

‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ প্রকল্পের এবারের বিজয়ীদের নাম গত ২৩ জুন মস্কোর মিউজিয়াম অব অ্যাটমিক এনার্জিতে ঘোষণা করা হয়। এরপর নির্ধারিত কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু হয় এই বৈজ্ঞানিক অভিযান। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রত্যয়ের অংশগ্রহণ এই কর্মসূচিতে দেশের প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি আগ্রহ গত কয়েক বছরে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তরুণদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন। প্রত্যয়ের একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অর্জিত সাফল্য এবং এবার উত্তর মেরু অভিযানে অংশগ্রহণ সেই ধারাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

উত্তর মেরু অভিযান শেষ করে দেশে ফেরার পর প্রত্যয়ের এই অভিজ্ঞতা অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও অনুসন্ধানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে। একটি বই, একটি শ্রেণিকক্ষ কিংবা একটি পরীক্ষাগারের বাইরেও যে পৃথিবীজুড়ে বিজ্ঞান শেখার অসংখ্য সুযোগ রয়েছে, এই অভিযান তারই বাস্তব উদাহরণ। বিশেষ করে কিশোর বয়সে এমন অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও পেশাগত লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বরফের বিশাল রাজ্যে পারমাণবিক আইসব্রেকারে চড়ে বাংলাদেশের পতাকাকে সঙ্গে নিয়ে এক কিশোরের এই যাত্রা তাই কেবল একটি অভিযান সম্পন্ন করার গল্প নয়। এটি কৌতূহল, অধ্যবসায়, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তরুণদের সম্ভাবনারও একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প। উত্তর মেরুর কঠিন পরিবেশ পেরিয়ে অর্জিত এই অভিজ্ঞতা প্রত্যয়ের ভবিষ্যৎ পথচলায় নতুন দরজা খুলে দেবে—এমন প্রত্যাশা এখন স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত