প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) নতুন উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগকে ঘিরে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক জি এম রবিউল ইসলামকে উপ-উপাচার্য এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহ মো. আতিকুল হককে কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগ পাওয়ার পর কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন অধ্যাপক শাহ মো. আতিকুল হক।
সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সহকারী সচিব মো. শাহ আলম সিরাজ স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে শাবিপ্রবির নতুন উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণে অধ্যাপক আতিকুল হকের অস্বীকৃতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
নিয়োগের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অধ্যাপক শাহ মো. আতিকুল হক দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতির কথা জানান। তবে কেন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করতে চান না, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে দেননি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর অস্বীকৃতির কারণ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও নিশ্চিতভাবে কোনো কারণ উল্লেখ করা যাচ্ছে না।
সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৮৭-এর সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে দুই শিক্ষককে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী অধ্যাপক জি এম রবিউল ইসলামকে উপ-উপাচার্য এবং ১৪(১) ধারা অনুযায়ী অধ্যাপক শাহ মো. আতিকুল হককে কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী চার বছর তাঁরা নিজ নিজ পদে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে চার বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যদি তাঁদের স্বাভাবিক অবসরের সময় এসে যায়, তাহলে যে সময়সীমা আগে পূর্ণ হবে, সেটিই কার্যকর হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী উপাচার্য তাঁদের যে দায়িত্ব অর্পণ করবেন, নবনিযুক্ত উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে তা পালন করতে হবে।
শাবিপ্রবির প্রশাসনিক কাঠামোয় উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ—দুটি পদই গুরুত্বপূর্ণ। উপ-উপাচার্য সাধারণত উপাচার্যের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ভূমিকা রাখেন। অন্যদিকে কোষাধ্যক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট, আয়-ব্যয় ও আর্থিক প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। ফলে এই দুটি পদে নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
অধ্যাপক জি এম রবিউল ইসলাম শাবিপ্রবির ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন উপ-উপাচার্য হিসেবে তাঁর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বয় তৈরি করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শাবিপ্রবির শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে অধ্যাপক শাহ মো. আতিকুল হক সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। তাঁকে কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও দায়িত্ব গ্রহণে তাঁর অস্বীকৃতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদটি কার্যকর রাখতে এখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
কোষাধ্যক্ষের পদটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন আর্থিক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিভিন্ন প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বাজেট বাস্তবায়ন এবং আর্থিক নীতিমালা অনুসরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে এই পদ জড়িত। তাই পদে নিয়োগের পর দায়িত্ব গ্রহণ না করার ঘটনা প্রশাসনিকভাবে কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
শাবিপ্রবি দেশের অন্যতম পরিচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসা, মানবিক এবং অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে নতুন নিয়োগের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ফেরানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনের স্থিতিশীলতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত রাখা, পরীক্ষার সময়সূচি, গবেষণা প্রকল্প, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যা সমাধানে কার্যকর প্রশাসন প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রশাসনিক নেতৃত্বকে এসব বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ, দায়িত্ব গ্রহণ এবং প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। শাবিপ্রবিতেও নতুন উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে একটি পদে নিয়োগ পাওয়ার পরই দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।
তবে অধ্যাপক আতিকুল হকের অস্বীকৃতির পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো ধরনের অনুমানকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ না করার কথা জানিয়েছেন—এটুকুই আপাতত নিশ্চিত। তাঁর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
এদিকে অধ্যাপক জি এম রবিউল ইসলামের নিয়োগের মধ্য দিয়ে শাবিপ্রবির উপ-উপাচার্য পদে নতুন দায়িত্বশীল যুক্ত হলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ তৈরির চ্যালেঞ্জ থাকবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরির ওপর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোষাধ্যক্ষ পদে নতুন নিয়োগ কার্যকর না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রশাসনে সম্ভাব্য জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সেটিও সামনে আসবে।
শাবিপ্রবির নতুন প্রশাসনিক নেতৃত্বের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো যেন একাডেমিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
নতুন উপ-উপাচার্যের নিয়োগের পাশাপাশি কোষাধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব গ্রহণের অস্বীকৃতি শাবিপ্রবির প্রশাসনিক অঙ্গনে যে প্রশ্ন তৈরি করেছে, তার উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অধ্যাপক আতিকুল হকের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনে জারি হওয়া নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ স্পষ্ট হয়েছে। এখন দায়িত্ব গ্রহণ, প্রশাসনিক কার্যক্রমে যোগদান এবং কোষাধ্যক্ষ পদে পরবর্তী ব্যবস্থা—এসব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই নজর থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের। এর মধ্য দিয়ে শাবিপ্রবির প্রশাসনে নতুন নেতৃত্বের কার্যক্রম কতটা গতি পায়, সেটিও সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।