প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর বনানীতে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের কার্যালয়ে টানা চার দিন অভিযান চালানোর পর সেটি সিলগালা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে ওই কার্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক সম্পদের দলিল, কয়েক শ চেক বই, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, স্থায়ী আমানত-সংক্রান্ত নথি এবং নগদ টাকা জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে প্রিমিয়ার গ্রুপের তিন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে দুদক। সব মিলিয়ে এই অনুসন্ধানকে ঘিরে ইকবাল ও তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর বনানীর ইকবাল সেন্টারের ১৬ তলায় এইচ বি এম ইকবালের কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুদকের উপপরিচালক মো. হোসাইন শরীফের নেতৃত্বে প্রিমিয়ার গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এ অভিযান চালানো হয়। কয়েক দফায় চার দিন তল্লাশি শেষে গত বুধবার কার্যালয়টি সিলগালা করা হয়। তবে পুরো ইকবাল সেন্টার সিলগালা করা হয়নি। ইকবালের ব্যক্তিগত চেম্বার এবং একটি পরিচালকের কক্ষ সিলগালা করা হয়েছে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অভিযানে জব্দ করা নথিপত্রের মধ্যে সম্পদের দলিলের সংখ্যা তিন শতাধিক। শুধু এসব দলিলের জব্দতালিকাই প্রায় ৩৭ পৃষ্ঠার বলে অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি ৫০০ থেকে ৬০০টির বেশি চেক বই পাওয়া গেছে। এসব নথি ও আর্থিক কাগজপত্র ইকবাল এবং তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ, লেনদেন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযানে সাতটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রও জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ম্যাকবুক, কয়েকটি মুঠোফোন, একটি নেক্সাস ট্যাব ও একটি আইপ্যাড রয়েছে। দুদকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ইকবালের ছেলেরা ব্যবহার করতেন। এসব ডিভাইসে থাকা তথ্য অনুসন্ধানের আওতায় থাকা আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ বা অন্যান্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয় কি না, তা যাচাই করা হতে পারে।
তল্লাশির সময় প্রায় দেড় লাখ টাকা নগদও জব্দ করা হয়েছে। একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তল্লাশি ও জব্দতালিকা সম্পন্ন করা হয় বলে অনুসন্ধান দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জব্দ করা বিভিন্ন সামগ্রী আলাদাভাবে নথিভুক্ত করতে পাঁচটি পৃথক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ফলে অভিযানে শুধু সম্পদের নথিই নয়, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত বিভিন্ন উপাদানও দুদকের হাতে এসেছে।
এদিকে কার্যালয়ে অভিযান ও সিলগালার মধ্যেই প্রিমিয়ার গ্রুপের তিন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে দুদক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা তালুকদার, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান এবং মহাব্যবস্থাপক এ ডি এম নাজমুল ইসলাম। সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এইচ বি এম ইকবাল এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাঁদের তলব করা হয়েছিল।
এর আগে গত ৩ আগস্ট তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদকে হাজির হতে বলা হয়। অনুসন্ধান কর্মকর্তারা তাঁদের কাছে প্রিমিয়ার গ্রুপের আর্থিক কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন লেনদেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য জানতে চাইতে পারেন। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থের প্রবাহ সম্পর্কে তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১৬টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে আরও পাঁচটি মামলার সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা রয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক অভিযানকে শুধু একটি কার্যালয়ে তল্লাশি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা অভিযোগ ও অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতার অংশ।
এইচ বি এম ইকবাল বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি নাম। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। তাঁর সঙ্গে প্রিমিয়ার গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক প্রভাবের কারণে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংকও ইকবাল সেন্টারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে আলোচনায় রয়েছে। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় দীর্ঘ সময় ধরে বনানীর এই ভবনে পরিচালিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন এবং অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর ইকবাল সেন্টার ও প্রিমিয়ার গ্রুপের কর্মকাণ্ড নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
দুদকের অভিযানকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক সম্পদের দলিল ও চেক বই জব্দের ঘটনা। একটি কার্যালয় থেকে এত বিপুল নথি উদ্ধারের ফলে সংশ্লিষ্ট সম্পদের প্রকৃতি, মালিকানা, ক্রয়-বিক্রয়, আর্থিক উৎস এবং লেনদেনের বৈধতা নিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে কোনো নথি জব্দ হওয়া মানেই সেখানে অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়। তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
একইভাবে প্রিমিয়ার গ্রুপের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদও অভিযোগ প্রমাণের সমতুল্য নয়। অনুসন্ধানকারী সংস্থা সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকে। পরবর্তী সময়ে জব্দ করা নথি, ডিজিটাল তথ্য ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দুদকের অভিযানের ফলে এখন ইকবাল সেন্টারের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের নথিপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী সংরক্ষণ এবং অনুসন্ধানের বিষয়টি সামনে এসেছে। জব্দ করা দলিল ও আর্থিক নথি যাচাই করে সম্পদের হিসাবের সঙ্গে ঘোষিত তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, কোনো লেনদেন সন্দেহজনক কি না এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হতে পারে।
একই সঙ্গে অনুসন্ধানের পরিধি আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। কারণ একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড সাধারণত একাধিক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে জব্দ করা নথিতে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে অনুসন্ধান অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দিকেও গড়াতে পারে।
তবে পুরো প্রক্রিয়ায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা যেমন দুর্নীতি দমনের জন্য প্রয়োজন, তেমনি অনুসন্ধানের প্রতিটি ধাপে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগও তৈরি হবে।
এই পরিস্থিতিতে দুদকের হাতে থাকা শত শত সম্পদের দলিল, বিপুলসংখ্যক চেক বই এবং ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ এখন অনুসন্ধানের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। একই সঙ্গে প্রিমিয়ার গ্রুপের কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র মিলিয়ে দেখা হবে। এসব যাচাই শেষে দুদকের অনুসন্ধান কোন দিকে গড়ায় এবং নতুন কোনো মামলা বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।