প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য দর্শকের সামনে গান গেয়ে অভ্যস্ত মার্কিন-সেনেগালিজ সংগীতশিল্পী একন। তাঁর কনসার্টে সাধারণত হাজারো মানুষ জড়ো হন। বিশাল মঞ্চ, আলোকসজ্জা, শব্দব্যবস্থা আর উচ্ছ্বসিত দর্শকের সামনে জনপ্রিয় গান পরিবেশন করাই তাঁর পরিচিত চিত্র। কিন্তু ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে এমন এক ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে গান গাইতে হয়েছিল তাঁকে, যেখানে শ্রোতা ছিলেন মাত্র তিনজন। আর সেই তিনজনের জন্যই পেয়েছিলেন প্রায় এক মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১২ কোটি টাকার বেশি।
ঘটনাটি আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানের আয়োজনের ব্যাপকতা জানলে। মধ্যপ্রাচ্যের একটি ধনী পরিবারের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতে গিয়েছিলেন একন। পুরো আয়োজন এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যেন সেখানে বিশাল কোনো আন্তর্জাতিক কনসার্ট হতে যাচ্ছে। একনের সঙ্গে গিয়েছিল তাঁর পুরো ট্যুরিং দল। ছিলেন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, লাইটিং টিম, রোড ম্যানেজার ও বিজনেস ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। শিল্পীর চাহিদা অনুযায়ী মঞ্চ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনাও করা হয়েছিল।
সম্প্রতি ‘ফ্ল্যাগর্যান্ট’ পডকাস্টে অংশ নিয়ে সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন একন। তাঁর বর্ণনায়, অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ও পরিবেশ দেখে শুরুতে তাঁর নিজেরও ধারণা ছিল না যে শেষ পর্যন্ত এত অল্পসংখ্যক মানুষের সামনে তাঁকে গান গাইতে হবে।
অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য একনের জন্য পাঠানো হয়েছিল বিশেষ একটি বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজ। সেটিতেও ছিল বিলাসবহুল নানা ব্যবস্থা। শোবার ঘর, শাওয়ার, গেম রুম এবং থিয়েটারের মতো সুবিধা ছিল উড়োজাহাজটিতে। এত বড় আয়োজন দেখে একনের মনে হয়েছিল, নিশ্চয়ই তিনি এমন কোনো অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন যেখানে বিপুলসংখ্যক অতিথি উপস্থিত থাকবেন।
কিন্তু অনুষ্ঠানের ভেন্যুতে পৌঁছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পান তিনি। বিশাল একটি হলের মধ্য দিয়ে তাঁকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সামনে ছিল বড় মঞ্চ, এলইডি আলো, লেজার এবং পেশাদার কনসার্টের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের আয়োজন। কিন্তু সেই বিশাল মঞ্চের সামনে দর্শকদের জন্য রাখা ছিল মাত্র তিনটি চেয়ার।
একন পডকাস্টে ঘটনাটি স্মরণ করে জানান, তিনি মঞ্চের পাশে বসে দর্শকদের অপেক্ষা করছিলেন। এক পর্যায়ে পরিবারের তিন সদস্য সেখানে উপস্থিত হন। ছিলেন পরিবারের একজন মেয়ে, তাঁর ভাই এবং মা। মূলত ওই মেয়েটির অনুরোধেই একনের গান শোনার আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি একনের বড় ভক্ত ছিলেন এবং প্রিয় শিল্পীকে সামনে থেকে গান গাইতে দেখার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন।
শুরুতে একন তাঁর স্বাভাবিক পরিবেশনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের মাঝপথে সেই তরুণী শিল্পীকে থামিয়ে একটি বিশেষ অনুরোধ করেন। তিনি একনের জনপ্রিয় গান ‘মিস্টার লোনলি’ শুনতে চান। একন প্রথমে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, সত্যিই কি শুধু এই গানটিই শুনতে চান তিনি। তরুণী সম্মতি জানান।
একন এরপর গানটি পরিবেশন করেন। কিন্তু গান শেষ হওয়ার পরই আসে আরেকটি অনুরোধ। আবার ‘মিস্টার লোনলি’। একন সেটিও গান। তারপর আবারও একই গান শোনানোর আবদার। এভাবে এক পর্যায়ে পুরো এক ঘণ্টা ধরে একই গান গাইতে হয় তাঁকে।
ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে একন নিজেই হাস্যরসের আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, তাঁকে যেন একটি সিডি প্লেয়ারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছিল। গান শেষ হলেই আবার একই গান চালু করার অনুরোধ আসছিল। বিশাল মঞ্চ, পেশাদার আলো, শব্দব্যবস্থা, ট্যুরিং টিম—সবকিছু প্রস্তুত ছিল একটি বড় কনসার্টের জন্য। অথচ বাস্তবে শিল্পীর সামনে বসে গান শুনছিলেন মাত্র তিনজন।
একনের জন্য ঘটনাটি যেমন অস্বাভাবিক ছিল, তেমনি পুরো আয়োজনের আর্থিক ব্যয়ও ছিল বিস্ময়কর। শিল্পীর পারিশ্রমিক ও মঞ্চসহ অন্যান্য আয়োজন মিলিয়ে অনুষ্ঠানটিতে প্রায় ৫০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছিল বলে জানান তিনি। এর মধ্যে তাঁর নিজের পারিশ্রমিক ছিল প্রায় এক মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় এক মিলিয়ন ডলারের মূল্য ১২ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ তিনজন মানুষের সামনে গান গাওয়ার জন্যই একন পেয়েছিলেন বিপুল অঙ্কের এই পারিশ্রমিক। যদিও ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক তারকাদের পারফরম্যান্সের পারিশ্রমিক সাধারণত সাধারণ কনসার্টের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে, তবু এত কমসংখ্যক শ্রোতার সামনে এত বড় আয়োজনের ঘটনা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
একন জানান, পরে পুরো ঘটনাটি নিয়ে তিনি নিজেই মজা করেছেন। তাঁর মনে হয়েছিল, অনুষ্ঠানটির প্রকৃতি যদি তাঁকে আগে জানানো হতো, তাহলে এত বড় আয়োজনের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। বিশাল মঞ্চ, আলাদা আলো, সাউন্ড সিস্টেম এবং পুরো ট্যুরিং টিমের বদলে তিনি হয়তো পরিবারের বসার ঘরেই গিয়ে গান গাইতে পারতেন।
শিল্পীর রসিক মন্তব্যের মধ্যেও ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। বড় তারকারা যখন ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন, তখন আয়োজকেরা অনেক সময় তাঁদের পরিচিত মঞ্চের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেন। ফলে অনুষ্ঠানে শ্রোতার সংখ্যা কম হলেও আয়োজনের পরিসর ছোট হয় না। বরং শিল্পীর মর্যাদা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরো আয়োজন করা হয়।
একনের ঘটনাটিও সম্ভবত সেই বাস্তবতারই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। শ্রোতা মাত্র তিনজন হলেও আয়োজনের কোনো অংশে যেন বড় কনসার্টের ঘাটতি না থাকে, সেদিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর সেই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন শিল্পী, যিনি শেষ পর্যন্ত নিজের সবচেয়ে পরিচিত গানগুলোর একটি বারবার গেয়ে পুরো সময় কাটিয়েছেন।
একনের সংগীতজীবনও এই ঘটনার মতোই বৈচিত্র্যময়। ২০০৪ সালে তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘ট্রাবল’ প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে তাঁর পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। ‘লকড আপ’ ও ‘লোনলি’ গান দুটি তাঁকে বিশ্বজুড়ে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে তোলে। বিশেষ করে ‘লোনলি’ গানটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম জনপ্রিয় সৃষ্টি হয়ে ওঠে। পরে ‘স্ম্যাক দ্যাট’, ‘আই ওয়ানা লাভ ইউ’, ‘ডোন্ট ম্যাটার’, ‘বিউটিফুল’ এবং ‘রাইট নাউ (না না না)’সহ একাধিক গান আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয়তা পায়।
সংগীতশিল্পী হিসেবে সফলতার পাশাপাশি একন গীতিকার, প্রযোজক ও উদ্যোক্তা হিসেবেও কাজ করেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বড় বড় মঞ্চে যেমন পারফর্ম করেছেন, তেমনি বিভিন্ন দেশের ব্যক্তিগত আয়োজনেও গান গেয়েছেন। তবে মাত্র তিনজন শ্রোতার সামনে এক ঘণ্টা ধরে একই গান পরিবেশনের অভিজ্ঞতা যে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাগুলোর একটি, তা তাঁর নিজের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।
সাধারণ শ্রোতার কাছে একজন আন্তর্জাতিক তারকার পারফরম্যান্স মানেই বড় মঞ্চ, হাজারো দর্শক আর করতালির শব্দ। কিন্তু একনের এই অভিজ্ঞতা সেই প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দিয়েছে। এখানে দর্শক ছিলেন মাত্র তিনজন, কিন্তু আয়োজন ছিল শত শত বা হাজারো দর্শকের উপযোগী। আর সেই তিনজনের একজনের পছন্দের গানকে কেন্দ্র করে পুরো এক ঘণ্টার পরিবেশনা গড়ে উঠেছিল।
ঘটনাটি একই সঙ্গে বিনোদন জগতের অর্থনৈতিক বাস্তবতারও একটি কৌতূহলোদ্দীপক উদাহরণ। একজন আন্তর্জাতিক তারকার সময়, পারফরম্যান্স এবং ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে উপস্থিতির মূল্য কতটা বেশি হতে পারে, একনের এই অভিজ্ঞতা তারই একটি চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত। তবে শেষ পর্যন্ত অর্থের হিসাব ছাপিয়ে ঘটনাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হয়ে উঠেছে সেই তিনটি চেয়ার এবং একটি গান—‘মিস্টার লোনলি’।
একজন শিল্পীর জন্য হাজারো মানুষের সামনে গান গাওয়া যেমন স্মরণীয় হতে পারে, তেমনি কখনো কখনো মাত্র তিনজন শ্রোতাও হয়ে উঠতে পারেন একটি পুরো জীবনের গল্পের অংশ। একনের ক্যারিয়ারে মধ্যপ্রাচ্যের সেই রাতটি সম্ভবত তেমনই এক ঘটনা—যেখানে কোটি টাকার পারিশ্রমিক, বিলাসবহুল উড়োজাহাজ, বিশাল মঞ্চ আর পেশাদার আয়োজনের শেষ দৃশ্য ছিল মাত্র তিনজন শ্রোতা এবং একই গান বারবার শোনানোর এক অদ্ভুত আবদার।