প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের জনপ্রিয় কাওয়ালি শিল্পী রাহাত ফতেহ আলী খানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিংবদন্তি কাওয়ালি শিল্পী ও তার চাচা নুসরাত ফতেহ আলী খানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার মাজারে গিয়ে কাওয়ালি পরিবেশনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মুখে পড়েছেন রাহাত। বিশেষ করে পরিবেশনার সময় উপস্থিত কয়েকজনের পক্ষ থেকে আকাশে কাগজের টাকা ছুড়ে দেওয়ার দৃশ্য নিয়েই সবচেয়ে বেশি আপত্তি দেখা দিয়েছে।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে প্রতিবছরই তার ভক্ত, স্বজন ও সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে কাওয়ালিকে পরিচিত করে তোলা এই শিল্পীর স্মরণে বিভিন্ন আয়োজনও হয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত হন পরিবারের সদস্য ও সংগীতশিল্পী রাহাত ফতেহ আলী খান। তার সঙ্গে ছিলেন ছেলে শাহজামান আলী খান।
মাজারে উপস্থিত ভক্তদের সামনে বাবা-ছেলে মিলে একটি কালাম পরিবেশন করেন। সুফি সংগীতের আবহে আয়োজিত সেই পরিবেশনার ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি সামনে আসার পর শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই রাহাতের গান পরিবেশনের বিষয়টিকে শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবে দেখলেও, মাজারের সামনে পরিবেশনার সময় তৈরি হওয়া দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, রাহাত ও তার ছেলে গান পরিবেশন করছেন এবং সামনে থাকা দর্শকদের একটি অংশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। এ সময় কয়েকজনকে আকাশে কাগজের টাকা ছুড়ে দিতে দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার কাওয়ালি সংস্কৃতিতে শিল্পীর প্রতি সম্মান বা আনন্দ প্রকাশের নানা প্রচলিত রীতি থাকলেও, মাজারের মতো ধর্মীয় ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানে এ ধরনের দৃশ্য অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মন্তব্যগুলোতেও সেই অসন্তোষের প্রতিফলন দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নুসরাত ফতেহ আলী খানের মতো একজন কিংবদন্তি শিল্পীর কবরের সামনে শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন আরও সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল। একজন মন্তব্যকারী কবরের সম্মান রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে সমালোচনা করেছেন। আবার কেউ কেউ রাহাতের শারীরিক বা মানসিক অবস্থাকে নিয়েও কটাক্ষ করেছেন। এমনকি অনেকে ধর্মীয় আবেগ প্রকাশ করে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ লিখেও নিজেদের আপত্তি জানিয়েছেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব মন্তব্যকে রাহাত ফতেহ আলী খানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যক্তিগত মন্তব্য, অনুমান কিংবা কটাক্ষের সঙ্গে যাচাই করা তথ্যের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভিডিওর দৃশ্য দেখে কারও শারীরিক অবস্থা বা ব্যক্তিগত আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ নয়। ফলে বিতর্কের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি দৃশ্যমান এবং কোনটি কেবল মন্তব্য বা অনুমান—সেই পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
রাহাত ফতেহ আলী খানের সঙ্গে নুসরাত ফতেহ আলী খানের সম্পর্ক শুধু পারিবারিক নয়, সংগীতের ক্ষেত্রেও গভীর। ছোটবেলা থেকেই তিনি নুসরাতের সঙ্গে সংগীতচর্চা ও পরিবেশনায় যুক্ত ছিলেন। চাচার পাশে থেকে কাওয়ালির পরিবেশ ও ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। নুসরাতের মৃত্যুর পর সেই সংগীতধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারী হিসেবে রাহাত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ৪৮ বছর বয়সে নুসরাত ফতেহ আলী খানের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতাঙ্গনে তার প্রভাব কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তার গান ও কাওয়ালি নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারত, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছেও তিনি এখনও বিশেষভাবে সমাদৃত।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল কাওয়ালিকে আন্তর্জাতিক সংগীতের বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়া। সুফি ভাবধারার এই সংগীতকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যা ভাষা ও ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছায়। তার কণ্ঠ, দীর্ঘ আলাপ, তালের বৈচিত্র্য এবং আধ্যাত্মিক আবেগ কাওয়ালিকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে।
তার এই উত্তরাধিকারই পরবর্তী সময়ে রাহাত ফতেহ আলী খান বহন করেন। পাকিস্তানি কাওয়ালি ও সুফি সংগীতের পাশাপাশি বলিউডের গানেও রাহাত ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রেম, বিরহ ও আধ্যাত্মিকতার নানা আবহে তার কণ্ঠ দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতপ্রেমীদের কাছে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করে আসছেন।
রাহাতের ছেলে শাহজামান আলী খানের সংগীতচর্চায় যুক্ত হওয়াকে অনেকে এই দীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্যের পরবর্তী অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ নুসরাত থেকে রাহাত এবং রাহাত থেকে পরবর্তী প্রজন্ম—কাওয়ালির এই পারিবারিক ধারাবাহিকতা এখনো সক্রিয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিবেশনায় বাবা-ছেলেকে একসঙ্গে দেখা যাওয়ায় সেই উত্তরাধিকার আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
এ কারণে নুসরাতের মৃত্যুবার্ষিকীতে রাহাতের মাজারে উপস্থিতি এবং সেখানে কাওয়ালি পরিবেশনকে অনেকেই পারিবারিক ও সংগীতগত শ্রদ্ধা নিবেদনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেও দেখছেন। অন্যদিকে মাজারের পরিবেশ, উপস্থিত দর্শকদের আচরণ এবং অর্থ ছোড়ার দৃশ্যকে কেন্দ্র করে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের আপত্তির মূল জায়গা হলো শ্রদ্ধা নিবেদনের ধরন ও পরিবেশের মর্যাদা।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই মূল বিতর্কটি অবস্থান করছে। একদিকে রয়েছে একজন কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি পরিবারের উত্তরসূরির আবেগ ও সংগীতের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন; অন্যদিকে রয়েছে ধর্মীয় ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানের পরিবেশে কী ধরনের আচরণ উপযুক্ত, সেই প্রশ্ন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও ভাইরাল হলে সেটিকে ঘিরে মুহূর্তের মধ্যে নানা ধরনের মতামত তৈরি হওয়া এখন স্বাভাবিক। কিন্তু একটি কয়েক মিনিটের ভিডিও পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনপরিচিত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য আচরণ নিয়ে মানুষের প্রশ্ন তোলার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি যাচাই না করা অভিযোগ বা ব্যক্তিগত কটাক্ষকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন না করাও জরুরি।
রাহাত ফতেহ আলী খান ও তার ছেলে নুসরাত ফতেহ আলী খানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই সেখানে সংগীত পরিবেশন করেছেন—এমনটাই ঘটনাটির মূল প্রেক্ষাপট। তবে সেই পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত কিছু দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রশ্ন তুলেছে, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ করে মাজারের সামনে টাকা ছোড়ার দৃশ্যটি অনেকের কাছে শ্রদ্ধা নিবেদনের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়নি।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের সংগীতজীবন ছিল দীর্ঘ, প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ। তার কণ্ঠ আজও অসংখ্য মানুষের কাছে আবেগ, আধ্যাত্মিকতা ও সংগীতের শক্তির প্রতীক। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ করতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের এমন আয়োজন তাই স্বাভাবিকভাবেই মানুষের নজর কেড়েছে। কিন্তু শ্রদ্ধা নিবেদনের সেই মুহূর্তই যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে, তখন শিল্পীর স্মৃতির চেয়ে আয়োজনের ধরনই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
রাহাত ফতেহ আলী খানকে ঘিরে সাম্প্রতিক এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, তা সময়ই বলবে। তবে ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, জনসমক্ষে কোনো সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় আয়োজন শুধু শিল্পীর পরিবেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সেখানে দর্শকের আচরণ, পরিবেশ এবং স্থানটির সামাজিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নুসরাত ফতেহ আলী খানের মতো কিংবদন্তির স্মৃতিকে ঘিরে আয়োজনে তাই সংগীতের আবেগের পাশাপাশি মর্যাদা ও সংযমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।