প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই বিপ্লবের সময় রাজশাহীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মামলায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় চারজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিচারিক শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলাটির শুনানি গ্রহণ করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের নির্দেশ দেন।
মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, মার্জিনা রায়হান, সহিদুল ইসলাম সরদার ও তারেক আবদুল্লাহ। শুনানিতে প্রসিকিউশন রাজশাহীতে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে এবং অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে।
শুনানির সময় প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন মামলার অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি ট্রাইব্যুনালে তিনটি ভিডিও প্রদর্শন করেন বলে জানা গেছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ভিডিওগুলোর কিছু দৃশ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অস্ত্র হাতে গুলি চালাতে দেখা যায়। শুনানির সময় কয়েকজন অভিযুক্তকে ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে শনাক্ত করার কথাও আদালতকে জানানো হয়।
প্রসিকিউশন এসব তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার আবেদন করে। একই সঙ্গে যেসব আসামি পলাতক রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং যাঁরা বর্তমানে আটক রয়েছেন, তাঁদের আদালতে হাজির করার জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করেন। এর ফলে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। অন্যদিকে চারজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
যে চারজনের বিরুদ্ধে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আসাদুজ্জামান আসাদ, ডাবলু সরকার, জহিরুল ইসলাম রুবেল এবং মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক। তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী কার্যক্রমে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত ব্যক্তি। মামলার অভিযোগে মোট ৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে ৩০ জুলাই প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। সেই অভিযোগের ওপর শুনানি শেষে মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের শেষ পর্যায়ের আন্দোলনের সময় রাজশাহী মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই দিন দুপুরে বোয়ালিয়া থানার শেখেরচক এলাকায় স্বচ্ছ টাওয়ারের বিপরীতে লবঙ্গ রেস্টুরেন্টের সামনে আন্দোলনকারী রায়হান আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে শাহ মখদুম কলেজের সামনে আনজুম সাকিব নিহত হন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ। ওই ঘটনাগুলোর পাশাপাশি সালমান ওরফে শিমুলসহ আরও বহু মানুষ আহত হওয়ার কথাও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজশাহী মহানগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে।
শেখেরচক স্বচ্ছ টাওয়ারের সামনের এলাকা, শাহ মখদুম কলেজের আশপাশ, পদ্মা নদীর বেড়িবাঁধ, আলুপট্টি মোড় এবং সংলগ্ন এলাকাগুলোতে সংঘটিত এসব ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা হিসেবে নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো।
তবে মামলায় অভিযোগ আমলে নেওয়া এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া এখনো চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত হওয়ার অর্থ নয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ও প্রমাণ উপস্থাপনের পাশাপাশি আসামিপক্ষের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও থাকবে। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের পরই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। ফলে এই পর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজশাহীতে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার বিচার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। রাজশাহীর ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও নিহত ও আহতদের পরিবারগুলো বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানিয়ে আসছে। ট্রাইব্যুনালে মামলা এগিয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্য এটি বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে রায়হান আলী ও আনজুম সাকিবের মৃত্যুর ঘটনা মামলার অভিযোগে গুরুত্ব পেয়েছে। আন্দোলনের উত্তাল সময়ে পরিবারের সদস্যদের চোখের সামনে কিংবা অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বজন হারানোর যন্ত্রণা যে কতটা গভীর, তা সহজে পরিমাপ করা যায় না। নিহতদের পরিবারের কাছে বিচার শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি তাদের স্বজন হারানোর ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠা এবং দায়ীদের জবাবদিহির প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত।
অন্যদিকে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর মামলার পরবর্তী ধাপগুলোতে সাক্ষ্য, নথি, ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে। আসামিপক্ষও এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেদের বক্তব্য ও আইনগত যুক্তি তুলে ধরতে পারবে।
মামলাটির পরবর্তী শুনানি ১৭ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করায় সামনে এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম অপেক্ষা করছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত ও তাদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও মামলার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী চারজনকে হাজির করার প্রক্রিয়াও সামনে আসবে।
রাজশাহীর জুলাই হত্যাকাণ্ডের এই মামলায় ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ৩৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং চারজনের বিরুদ্ধে হাজিরার নির্দেশ সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। এখন মামলার পরবর্তী শুনানিতে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপিত হয় এবং আসামিপক্ষ কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার বিচার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সামাজিক অধ্যায়। নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে, আর অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়া জরুরি। ন্যায়বিচারের স্বার্থে উভয় পক্ষের অধিকার নিশ্চিত করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজশাহীর মামলাটি সেই বিচারপ্রক্রিয়ারই একটি অংশ। মঙ্গলবারের আদেশে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী কার্যক্রমের পথ নির্ধারণ করেছেন। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের শুনানির মধ্য দিয়ে মামলাটি আরও এক ধাপ এগোবে। সেখানে উপস্থাপিত তথ্য, প্রমাণ ও আইনগত বক্তব্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে এগোবে বিচারিক কার্যক্রম।