প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পালা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে হলে একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও জনবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমের সাফল্যের ওপর সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, অর্থনৈতিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের পাশাপাশি কর প্রশাসনে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি ও হয়রানি কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। বিশেষ করে করদাতাদের কাছে রাজস্ব প্রশাসনের আচরণ, সেবা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করদাতাদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও টেকসই হবে। তাই করদাতাদের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের প্রভাব দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়েছে এবং এনবিআরও এর বাইরে ছিল না। নীতি ও নিয়মের পরিবর্তে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া, কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব কিংবা কারও প্রতি বিরূপ আচরণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার মতো অভিযোগের কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এখন সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার সময় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তন এবং ব্যবসায় নতুন নতুন মডেলের আবির্ভাবের কারণে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রচলিত জ্ঞান ও পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, বাণিজ্যিক আর্থিক অপরাধ, মানি লন্ডারিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসনকেও আধুনিক করতে হবে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে করদাতা শনাক্তকরণ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং রাজস্ব আহরণের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে। ফলে সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর বা টেকসই হতে পারে না। কর প্রদানে সক্ষম কিন্তু এখনো কর ব্যবস্থার আওতায় আসেননি—এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে নিয়মের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে করদাতাদের ওপর বারবার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে রাজস্ব বাড়ানোর পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য কেবল বেশি কর আদায় করা নয়; বরং মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। করদাতা যেন কর দেওয়াকে ভয় বা হয়রানির বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
এ জন্য কর ব্যবস্থাপনা ও কর আদায়ের পদ্ধতি সহজ, স্বচ্ছ এবং দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয় বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি ডিজিটাল ও তথ্যনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনগণের কাছে এনবিআরকে আরও বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দায়িত্ব কর্মকর্তাদেরই নিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যা থাকবে, তবে আলোচনা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
রাজস্ব সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দেশের সাম্প্রতিক রাজস্ব আহরণের ইতিবাচক প্রবণতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ পায়। দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করলে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাজস্ব সম্মেলনের পাশাপাশি চা শ্রমিকদের জন্য নেওয়া একটি মানবিক উদ্যোগেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সিলেট বিভাগের চা-বাগান শ্রমিকদের প্রতিকূল আবহাওয়ায় সুরক্ষার জন্য বেসরকারি খাতের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিলের সহায়তায় ২০ হাজার রেইনকোট বিতরণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের ১০ জন চা শ্রমিকের হাতে রেইনকোট তুলে দিয়ে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এ উদ্যোগের আওতায় সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন চা-বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ করা হবে। মোট ২০ হাজার রেইনকোটের মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ১০ হাজার, শেভরন বাংলাদেশ পাঁচ হাজার এবং পাণ্ডুঘর গ্রুপ পাঁচ হাজার রেইনকোট সরবরাহ করছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে সামান্য করে এগিয়ে আসে, তাহলে বড় বড় সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব। জনকল্যাণমূলক ও মানবিক উদ্যোগে বেসরকারি খাতকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। যারা সমাজের পিছিয়ে পড়া ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে চান, সরকার তাদের পাশে থাকবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
চা শ্রমিকদের জন্য রেইনকোট বিতরণের উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলোতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও নিয়মিত কাজ করেন। বর্ষাকালে টানা বৃষ্টি ও ভেজা পরিবেশে কাজ করা তাদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করে। এমন বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা উপকরণ শ্রমিকদের কর্মপরিবেশকে কিছুটা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে পারে।
রেইনকোট গ্রহণের সময় শ্রীমঙ্গলের মাজদিহি চা-বাগানের শ্রমিক সন্তুকী রায় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা হিসেবে চা-পাতা উপহার দেন। ঘটনাটি অনুষ্ঠানে মানবিক আবহ তৈরি করে। একই সঙ্গে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে বেসরকারি খাতের সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব সহায়তা তৈরি করতে পারে, সেই দিকটিও সামনে আসে।
একদিকে রাজস্ব সম্মেলনে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে শক্তিশালী ও জনবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব, অন্যদিকে চা শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা উপকরণ বিতরণ—দুটি উদ্যোগেই সরকারের নীতিতে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয়ের বার্তা পাওয়া যায়। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে রাজস্ব আহরণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতার সুফল সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি আস্থাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থার রূপরেখা উঠে এসেছে। করদাতার সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসনের সম্পর্ক উন্নয়ন, কর ব্যবস্থাকে সহজ করা, দুর্নীতি ও হয়রানি কমানো, নতুন করদাতা শনাক্ত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগানোর ওপর দেওয়া গুরুত্ব ভবিষ্যৎ রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে চা শ্রমিকদের জন্য সিএসআর তহবিলের সহায়তায় নেওয়া উদ্যোগটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সামাজিক সমস্যার সমাধানে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।