প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) একটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিয়ের গাউন ও আনুষঙ্গিক পোশাক। জার্মান বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেডের তৈরি এসব পণ্য ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশের বাজারে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের পণ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
২০২২ সালের এপ্রিল থেকে আদমজী ইপিজেডে উৎপাদন শুরু করা ইউবিএফ ব্রাইডাল বিভিন্ন ধরনের ওয়েডিং গাউন, এক্সক্লুসিভ অ্যাকসেসরিজ, সাটিন ও লেসের পোশাক, বিয়ের ঘোমটা, পেটিকোট, স্যুট, জ্যাকেট, বোলেরো ও গয়না তৈরি করছে।
প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৩৫৭ জন কর্মী কাজ করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশে তৈরি এসব পোশাক প্রথমে জার্মানিতে পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশে সরবরাহ করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছালেও পোশাকগুলোর সঙ্গে অটুট থাকছে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়।
বিদেশের বাজারে এসব বিয়ের পোশাক সাধারণত ৪০০ থেকে ৫০০ ডলারে বিক্রি হয়। কিছু বিশেষায়িত পোশাকের দাম ১ হাজার ডলার পর্যন্তও হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া অধিকাংশ পোশাকের মূল্য ৪০০ থেকে ৫০০ ডলারের মধ্যে।
ইউবিএফ ব্রাইডালের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. রবিউল হক সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর সময় ব্রাইডাল পোশাক তৈরিতে দক্ষ কর্মী ও অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপকের সংকট ছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের উদ্যোগে কর্মী ও ম্যানেজারদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা যখন বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করি, তখন এ ধরনের বিশেষায়িত ব্রাইডাল পোশাক তৈরিতে অভিজ্ঞ কর্মী পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞ ম্যানেজারও পাওয়া কঠিন ছিল।”
দক্ষতার সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বিয়ের গাউন
একটি ব্রাইডাল গাউন তৈরির প্রক্রিয়া সাধারণ পোশাকের তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম। নকশা অনুযায়ী গাউনকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে তৈরি করা হয়। বডিস, করসেট, স্কার্ট ও ট্রেনের মতো অংশে সূক্ষ্ম লেস, ফুল ও বিভিন্ন অলংকার সেলাই করা হয়। পরে সেগুলো একত্র করে তৈরি করা হয় পূর্ণাঙ্গ পোশাক।
কারখানাটি পরিদর্শনে দেখা যায়, কর্মীদের কেউ মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন, কেউ লেস ও অলংকার সংযুক্ত করছেন। অন্য একটি দল তৈরি পোশাকের মান পরীক্ষা করছে। সবশেষে পণ্যগুলো প্যাকেজিং করে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
পাঁচতলা ভবনে অবস্থিত কারখানাটি মাত্র একটি উৎপাদন লাইন দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমানে সেখানে আটটি উৎপাদন লাইন রয়েছে। ভবিষ্যতে উৎপাদন লাইন ১০ থেকে ১৩টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি লাইনে প্রায় ২৩ জন অপারেটর কাজ করবেন।
বিয়ের পোশাকের আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠানটি আগামী দুই বছরে আরও ৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
তিন মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ
ব্রাইডাল পোশাকে ব্যবহৃত কাপড় সাধারণ পোশাকের কাপড়ের তুলনায় অনেক বেশি নরম ও সংবেদনশীল। লাইনিং, অর্গানজা ও সূক্ষ্ম লেসের মতো উপকরণ ব্যবহারের কারণে উৎপাদনকর্মীদের বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন।
রবিউল হক সিদ্দিকী জানান, নতুন কর্মীদের সরাসরি উৎপাদন লাইনে যুক্ত করা হয় না। প্রথমে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং সাধারণত প্রায় তিন মাস প্রশিক্ষণের পর তারা উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হন।
কারখানাটিতে প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছেন খাদিজা বেগম। তিনি লেস ফিটিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এই কাজ শুরু করার আগে প্রায় পাঁচ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তাঁর বেতন ছিল ১০ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৩০০ টাকা।
চাঁদপুর থেকে এসে কারখানাটিতে কাজ করছেন শিখা আক্তার। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি এখানে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি পোশাকের গুণগত মান যাচাইয়ের কাজ করছেন।
পোল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে উৎপাদন স্থানান্তরের পরিকল্পনা
ইউবিএফের পোল্যান্ডেও একটি কারখানা রয়েছে। সেখানে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কিছু পণ্য বাংলাদেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ লক্ষ্যে পোল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষকরা বাংলাদেশে এসে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এর ফলে বাংলাদেশে উৎপাদনের পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি ডিজাইনারদের তৈরি নকশা অনুযায়ী পোশাক উৎপাদন করছে। তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্থানীয় ডিজাইনারদের নকশায় ব্রাইডাল পোশাক তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
একই সঙ্গে দেশে এমব্রয়ডারি ও লেস উৎপাদন বাড়িয়ে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে বিয়ের জুতাও উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাড়ছে বৈশ্বিক ব্রাইডাল পোশাকের বাজার
বিশ্বজুড়ে বিয়ের পোশাকের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক ব্রাইডাল পোশাকের বাজারের আকার ছিল প্রায় ৮২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজার ১০৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি, বিলাসবহুল পোশাকের চাহিদা এবং কাস্টমাইজড বিয়ের পোশাকের জনপ্রিয়তা বাড়ায় ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজারে বার্ষিক ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির বাজারে বাংলাদেশি উৎপাদকদের প্রবেশ তৈরি পোশাক খাতকে সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত পণ্যের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
আদমজী ইপিজেডে বাড়ছে রপ্তানির পরিসর
ঐতিহাসিক আদমজী জুট মিলের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর বিশাল শিল্পভূমিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সরকার। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে আদমজী ইপিজেড।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত এই ইপিজেডের আয়তন ২৯২ দশমিক ৬২ একর। গত দুই দশকে সেখানে উচ্চমূল্যের পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠেছে।
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আদমজী ইপিজেডে ৭৬ হাজার ২৭ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে ৮৪৭ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। ইপিজেডের বিভিন্ন কারখানা থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে।
টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল কর্স ও ভ্যান হিউসেনের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্যও এখানকার কারখানাগুলো পণ্য তৈরি করছে।
ইউবিএফ ব্রাইডালের ব্রাইডাল পোশাক উৎপাদন সেই রপ্তানি ভিত্তিকে আরও বৈচিত্র্যময় করছে। সাধারণ তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিয়ের গাউন, সূক্ষ্ম লেসের পোশাক ও অন্যান্য বিশেষায়িত পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে।