আদমজী ইপিজেডের রপ্তানি ১.১৭৯ বিলিয়ন ডলার

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলের পরিত্যক্ত শিল্পভূমিতে গড়ে ওঠা আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি ও কর্মসংস্থান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্ণ হওয়ার আগেই ইপিজেডটির বার্ষিক রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রচলিত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনেও গুরুত্ব বাড়ছে।

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, আদমজী ইপিজেডে এ পর্যন্ত প্রায় ৮৪৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানকার কারখানাগুলো মোট ১১ দশমিক ১১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ইপিজেডটির বার্ষিক রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরের অর্থবছরে রপ্তানি আরও বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ দশমিক ১৭৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ইপিজেডটি পুরোপুরি চালু হলে বছরে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হবে বলে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান রপ্তানি তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, টানা দ্বিতীয় অর্থবছরের মতো ইপিজেডটির রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে এলে বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইপিজেডের সব প্লট ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়ে গেছে। তাই নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে ইপিজেড সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।

৭৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান

প্রায় ২৯২ একর আয়তনের আদমজী ইপিজেডে বর্তমানে ৪৭টি উৎপাদন ইউনিট চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ৭৬ হাজার ২৭ জন। নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে গেলে সরাসরি কর্মসংস্থান ১ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ইপিজেডের কারখানাগুলোতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ব্রাইডাল পোশাক, সেফটি ফুটওয়্যার, অটোমোটিভ সিট-ট্রিম কভারসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পণ্য তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল করস ও ভ্যান হিউসেনের মতো ব্র্যান্ডের জন্যও পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।

এই বৈচিত্র্য আদমজী ইপিজেডকে প্রচলিত পোশাকনির্ভর রপ্তানি অঞ্চল থেকে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে রূপান্তর করছে।

পুরুষদের উচ্চমূল্যের পোশাকে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার

আদমজী ইপিজেডের অন্যতম বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড। রোমানিয়া-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানটি পুরুষদের টেইলর্ড স্যুট, ব্লেজার ও ফরমাল ট্রাউজার তৈরি করে।

প্রতিষ্ঠানটি কারখানায় ৪৫ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে সেখানে ৮ হাজার ১৯৪ জন কর্মরত। এর মধ্যে ৮ হাজার ১৬০ জন বাংলাদেশি এবং ৩৪ জন বিদেশি কর্মী।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৯৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য উচ্চমূল্যের স্যুট ও ফরমাল পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

বিশেষায়িত ফুটওয়্যারেও বাড়ছে সক্ষমতা

ইউক্রেনীয় বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান সুপার প্রোটেকটিভ শুজ (প্রা.) লিমিটেডও আদমজী ইপিজেডের বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনের অন্যতম উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি ১৩ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং প্রায় ১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারের সেফটি শু, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত জুতা, সামরিক বুটসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ফুটওয়্যার রপ্তানি করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লাভরিক আন্দ্রিতি জানান, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত জুতা উৎপাদনের জন্য নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হচ্ছে। ইউরোপের পাশাপাশি তাইওয়ান ও চীন থেকেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে।

জাপানি গাড়ির জন্য অটোমোটিভ পণ্য

আদমজী ইপিজেডে উৎপাদিত পণ্যের বৈচিত্র্যের আরেকটি উদাহরণ জাপানি কোম্পানি টিএস টেক বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ৪ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং এখানে ৫১২ জন কর্মরত।

জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের জন্য অটোমোটিভ সিট-ট্রিম কভার তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলারে।

উৎপাদনে ব্যবহৃত অধিকাংশ কাঁচামাল জাপান ও চীন থেকে আমদানি করা হয়। বাংলাদেশে সিট-ট্রিম কভার তৈরির পর তা জাপানের বিভিন্ন উৎপাদন কারখানায় পাঠানো হয়।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাতোরু ওনিশি জানান, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অটোমেশনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকাজে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে।

৩৭ দেশে যাচ্ছে ব্রাইডাল পোশাক

উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত পোশাক উৎপাদনে আদমজী ইপিজেডের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে জার্মান বিনিয়োগের ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানটি প্রিমিয়াম ওয়েডিং ও ইভনিং পোশাক তৈরি করে। তাদের পণ্যের তালিকায় রয়েছে ব্রাইডাল ড্রেস, স্যুট, জ্যাকেট, বোলেরো, ভেইল, পেটিকোট ও জুয়েলারি।

৩ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে ২০২২ সালের এপ্রিলে উৎপাদন শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৩৫৭ জন স্থানীয় কর্মী কাজ করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

ইউবিএফের তৈরি পোশাক প্রথমে জার্মানিতে যায়। পরে সেখান থেকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ প্রায় ৩৭টি দেশে সরবরাহ করা হয়। ফলে এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছালেও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয় বহন করছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. রবিউল হক সিদ্দিকী জানান, শুরুতে বাংলাদেশে বিশেষায়িত ব্রাইডাল পোশাক তৈরিতে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি ছিল। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের উদ্যোগে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে।

বর্তমানে স্থানীয়ভাবে এমব্রয়ডারি ও লেস উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশেই ফুটওয়্যার উৎপাদনের পরিকল্পনাও করছে প্রতিষ্ঠানটি।

পাটকল থেকে আধুনিক রপ্তানি কেন্দ্রে

আদমজী ইপিজেডের বর্তমান সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি বড় শিল্প রূপান্তরের ইতিহাস।

১৯৫০ সালে আদমজী পরিবার সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী জুট মিলস প্রতিষ্ঠা করে। প্রায় ১ হাজার একর জমিতে গড়ে ওঠা এই পাটকল একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাটকল হিসেবে পরিচিত ছিল। শ্রমিক আবাসন, বাজার, স্কুলসহ পুরো এলাকা একটি বড় শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর মিলটি জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মিলটির আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ৩০ জুন আদমজী জুট মিল বন্ধ হয়ে যায়। তখন সেখানে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।

পরিত্যক্ত শিল্পভূমিকে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর জমিটি বেপজার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয় এবং ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে আদমজী ইপিজেড উদ্বোধন করা হয়।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে ইপিজেডটির বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৪ মিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ছিল শূন্য দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। দুই দশকের ব্যবধানে সেই একই শিল্পভূমি এখন ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বার্ষিক রপ্তানি করা একটি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সামনে আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা

আদমজী ইপিজেডের বর্তমান প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হলো এর কৌশলগত অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অবস্থান হওয়ায় পণ্য পরিবহন ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও এটি সুবিধাজনক।

নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে এলে বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে বেপজা। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানও ১ লাখের বেশি হতে পারে।

তবে আদমজী ইপিজেডের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুধু রপ্তানির পরিমাণে নয়; পণ্যের ধরনেও। একসময় যেখানে পাট ছিল শিল্পের মূল ভিত্তি, সেখানে এখন উচ্চমূল্যের স্যুট, ব্রাইডাল পোশাক, সেফটি ফুটওয়্যার ও অটোমোটিভ যন্ত্রাংশের মতো বিশেষায়িত পণ্য তৈরি হচ্ছে।

অর্থাৎ, পরিত্যক্ত একটি বৃহৎ পাটকলের জমি দুই দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে পরিণত হয়েছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত