প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হলেও তা প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন জাতীয় সংসদে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোট গ্রহণ চলে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলের বিরোধীদলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় ভোট গ্রহণের আগেই কার্যত নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন এবং রাষ্ট্রপতি পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পথও তৈরি হতে পারত।
তিনি বলেন, “৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকেও আমরা এগোতে পারতাম। কিন্তু সেটা হচ্ছে না।”
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, তাঁরা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার না করলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক করা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই তাঁদের অংশগ্রহণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, বিরোধী দলগুলোর জোট থেকে প্রার্থী দিয়ে তাঁরা দেখাতে চেয়েছেন যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল সরকারি দলের একক প্রার্থী নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। জনগণের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেও এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিরোধী জোট।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আগের ব্যবস্থাই অনুসরণ করছে।
নাহিদ বলেন, এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা আবারও বজায় থাকছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জনগণের কাছে সেই বার্তাই দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের নিয়মিত অধিবেশনের পরিবর্তে বৈঠক ডাকা এবং সেই বৈঠকে স্পিকারের পরিবর্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্ব করার বিষয়টিও তুলে ধরেন নাহিদ। তাঁর মতে, এসব বিষয় নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দল গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চায়—এই বার্তা দেওয়ার জন্যই তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তাঁর দাবি, এর ফলে সরকারের বক্তব্য ও কাজের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি মুখে এক ধরনের কথা বললেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এ কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নাহিদ আরও অভিযোগ করেন, সরকার গণভোটের রায়, জনগণ এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণের অভিযোগও করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর দাবি, দেশের প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় দলীয় প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও একই ধরনের দলীয়করণের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
নাহিদ বলেন, দলীয় প্রার্থী দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখছেন। সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় এ নির্বাচনকে পুরোপুরি স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক বলা যায় না।
তাঁর ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে গণতন্ত্রের পক্ষে রয়েছে বলে মনে করার সুযোগ কমে যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলের প্রভাব কমিয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি ও বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে অন্তত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে চেয়েছে। তাঁদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন শুধু ফলাফল নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়; বরং জনগণের সামনে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।