দেশের চাহিদা মিটিয়ে ১৩২ দেশে ওষুধ রপ্তানি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার
দেশের চাহিদা মিটিয়ে ১৩২ দেশে ওষুধ রপ্তানি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একসময় দেশের মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় একটি অংশের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো বাংলাদেশকে। প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানি করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় হতো। সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দীর্ঘদিনের নীতি সহায়তা, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবল গড়ে ওঠার ফলে দেশের ওষুধশিল্প এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে দেশের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশি ওষুধ জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে।

বর্তমানে বিশ্বের ১৩২টি দেশে বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। গত এক দশকে এই খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ১৬৭ শতাংশ। একসময় যেখানে ওষুধ রপ্তানি করে বছরে ৮৯ মিলিয়ন ডলার আয় হতো, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে। সর্বশেষ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায়ও রপ্তানি আয় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে দেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় তৈরি পোশাকের বাইরে তুলনামূলক উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর ওষুধশিল্পের গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের এই অগ্রযাত্রা শুধু রপ্তানি আয়ের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, দেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ দেশের বাজারেই পাওয়া যাচ্ছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলেও স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা থাকার কারণে জরুরি ওষুধের সরবরাহ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। করোনা মহামারির সময়ও স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ও দ্রুত অভিযোজনের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে।

বর্তমানে দেশের ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার। এই বড় বাজারকে কেন্দ্র করে দেশীয় কোম্পানিগুলো শুধু সাধারণ ওষুধ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই; ধীরে ধীরে জটিল ও উচ্চমূল্যের ওষুধ, বিশেষায়িত চিকিৎসায় ব্যবহৃত পণ্য, বায়োলজিক্যাল ওষুধ এবং বিভিন্ন আধুনিক ফর্মুলেশনের উৎপাদনেও সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণের সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠছে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৪০০ জেনেরিক ওষুধ এবং ৪৫ হাজার ব্র্যান্ড রয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় আগে, ১৯৯৩ সালে দেশে জেনেরিক ওষুধের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০ এবং ব্র্যান্ডের সংখ্যা ছিল ২০ হাজারেরও কম। অর্থাৎ এই সময়ে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা এবং ওষুধের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিল্পের এই সম্প্রসারণ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশি বাজারে প্রবেশের সুযোগও তৈরি করেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৩৮ মিলিয়ন ডলারের মতো ওষুধ রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২১৩ মিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক বাণিজ্যে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার চাপের মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধিকে শিল্পটির সক্ষমতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশি ওষুধের বাজার এখন শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধ যাচ্ছে। গত অর্থবছরে শ্রীলঙ্কা ছিল বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির অন্যতম প্রধান গন্তব্য। দেশটিতে প্রায় ৩০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। মিয়ানমারে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার, ফিলিপাইনে ১৯ মিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় ১৯ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। কম্বোডিয়া ও আফগানিস্তানে প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার করে, কেনিয়ায় ১১ মিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানে ১০ মিলিয়ন ডলার, চিলিতে ৯ মিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্যে প্রায় চার মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের মতো তুলনামূলক কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাজারে প্রবেশ বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এসব বাজারে ওষুধ রপ্তানি করতে হলে উৎপাদনপ্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ, কারখানার পরিবেশ, পরীক্ষাগার এবং পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। ফলে এসব বাজারে বাংলাদেশি কোম্পানির উপস্থিতি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নতিরও একটি ইঙ্গিত বহন করে।

তবে সাফল্যের পাশাপাশি সামনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের বড় সংকট দেখা দিলে উৎপাদন খরচ ও সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা আরও উন্নত করা এখন শিল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন।

আরেকটি বড় বিষয় হলো বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট কাঠামোর পরিবর্তিত বাস্তবতা। এতদিন এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন সুবিধা বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে দ্রুত বিকাশে সহায়তা করেছে। ভবিষ্যতে সেই সুবিধার পরিধি কমে গেলে স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি গবেষণানির্ভর, উদ্ভাবনী এবং প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। একই সঙ্গে পেটেন্ট আইন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং শিল্পনীতিতে সময়োপযোগী সংস্কারও প্রয়োজন হবে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সামনে এখন শুধু বেশি ওষুধ উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেই হবে না; বরং বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের ওষুধ ও বিশেষায়িত পণ্যের বাজার দখলের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। গবেষণা, বায়োসিমিলার, ক্যানসার চিকিৎসার ওষুধ, ইনসুলিন, হরমোন, জটিল ইনজেকটেবল এবং অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসাপণ্যের উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রপ্তানি আয় আরও দ্রুত বাড়তে পারে।

একসময় বিদেশি ওষুধের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ আজ নিজস্ব চাহিদার প্রায় পুরোটাই স্থানীয়ভাবে পূরণ করছে এবং বিশ্বের বহু দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। ১৩২টি দেশে পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং এক দশকে রপ্তানি আয় ১৬৭ শতাংশ বাড়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে দেশের শিল্পায়নের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তবে এই সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে কাঁচামাল উৎপাদন, গবেষণা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে দেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওষুধশিল্প ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত