দুই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২০ বার
দুই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরও সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করেছে সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হিসেবে হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য তাঁদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রোববার একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। পরিপত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। নতুন দায়িত্ব বণ্টনের ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিস্তৃত কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্র দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। এতে একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়, মানবাধিকার, জলবায়ু, সমুদ্রসম্পদ, প্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কূটনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে আলাদা নেতৃত্ব নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হলো।

পরিপত্র অনুযায়ী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া হুমায়ুন কবির মূলত বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কসংক্রান্ত বিষয় দেখভাল করবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো তাঁর দায়িত্বের আওতায় থাকবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, অভিবাসন, সীমান্তসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা ইস্যু এ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ।

হুমায়ুন কবিরের দায়িত্বের মধ্যে অনাবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ও রাখা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক ও প্রবাসীদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ। কর্মসংস্থান, কনস্যুলার সেবা, নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিষয়, প্রবাসীদের অধিকার এবং বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে এ খাতটি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে রাখার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।

এর বাইরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক অর্পিত অন্যান্য দায়িত্বও পালন করবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন ও পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার অনুযায়ী ভবিষ্যতে তাঁকে অতিরিক্ত কোনো দায়িত্ব দেওয়া হলে সেটিও তিনি দেখভাল করবেন।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলামকে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক কয়েকটি ক্ষেত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, মানবাধিকার, গবেষণা ও উদ্ভাবন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-সংক্রান্ত বিষয়।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মানবাধিকার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনায় মানবাধিকার পরিস্থিতি, নাগরিক অধিকার, শ্রম অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর নানা বিষয় উঠে আসে। ফলে এই দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

গবেষণা ও উদ্ভাবনও বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নতুন ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পররাষ্ট্রনীতিকে তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক করার প্রয়োজন বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দায়িত্ব আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন, অভিযোজন এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। নতুন দায়িত্ব বণ্টনে এ বিষয়টি আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জলবায়ু কূটনীতিতে আরও সমন্বিত উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শামা ওবায়েদ ইসলামের দায়িত্বের মধ্যে সৃজনশীল অর্থনীতিও রয়েছে। সংস্কৃতি, সৃজনশীল শিল্প, বিনোদন, ডিজিটাল কনটেন্ট ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সৃজনশীল খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সৃজনশীল পণ্য ও সেবার আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণেও কূটনৈতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-সংক্রান্ত বিষয়ও তাঁর দায়িত্বে রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। উত্তরণের পর বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা, শুল্ক, বাজারসুবিধা, মেধাস্বত্ব, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। এসব বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দায়িত্ব বণ্টনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি খাত। আধুনিক কূটনীতিতে প্রযুক্তি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল বাণিজ্য, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো বিষয় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।

সমুদ্র আইন ও সমুদ্রসম্পদও শামা ওবায়েদ ইসলামের দায়িত্বের আওতায় রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার, সামুদ্রিক বাণিজ্য, নীল অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুসরণ করে বাংলাদেশের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করা এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এই দায়িত্বের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কৌশলগত স্বার্থও সরাসরি যুক্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য কূটনীতিও নতুন দায়িত্ব বণ্টনে গুরুত্ব পেয়েছে। করোনা মহামারির পর আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন আরও বেড়েছে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নিজের স্বার্থ ও সক্ষমতা তুলে ধরতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে।

সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতির দায়িত্বও শামা ওবায়েদ ইসলামের ওপর দেওয়া হয়েছে। খেলাধুলা ও সংস্কৃতি দেশের মানুষের সঙ্গে দেশের মানুষের সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্পী বিনিময় এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টনের এই সিদ্ধান্তকে সরকারের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় কাজের পরিধি আরও সুসংগঠিত করার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একজন প্রতিমন্ত্রী যেখানে মূলত দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয় দেখবেন, অন্যজন সেখানে মানবাধিকার, জলবায়ু, প্রযুক্তি, সমুদ্র, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও এলডিসি উত্তরণের মতো নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ইস্যুতে মনোযোগ দেবেন।

পরিপত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে, দুই প্রতিমন্ত্রীই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করবেন। অর্থাৎ দায়িত্ব আলাদা হলেও পররাষ্ট্রনীতির সামগ্রিক সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে।

বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার ক্রমেই বহুমাত্রিক হচ্ছে। ঐতিহ্যগত রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সমুদ্রসম্পদ, অভিবাসন, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতিও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। নতুন দায়িত্ব বণ্টনে এসব ক্ষেত্রকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী দিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন বিশেষায়িত ইস্যুতে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত