যত্রতত্র বালু উত্তোলনে নক্লায় নদীভাঙন তীব্র

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫১ বার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শেরপুরের নকলা উপজেলার চরাঞ্চলের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃগী ও ব্রহ্মপুত্র নদে যত্রতত্র বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বছরের পর বছর নদী দুটি খনন না হওয়ায় পলি জমে নাব্যতা কমেছে। এর মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে নদীর বিভিন্ন স্থানে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। বদলে গেছে নদীর গতিপথ। বর্ষাকালের পাশাপাশি এখন সারা বছরই নদীতীর ভাঙছে।

ইতোমধ্যে চরঅষ্টধার ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বহু বসতভিটা, কৃষিজমি, সড়ক ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গৃহহীন হয়ে পড়েছে কয়েকশ পরিবার। নদীভাঙনের কারণে চরাঞ্চলে দারিদ্র্যও বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতের মেঘালয় ও গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মৃগী নদীর উৎপত্তি। শেরপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটি নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ও চরঅষ্টধার ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে এটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা হিসেবেও পরিচিত।

চন্দ্রকোনা বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের চকবরইগাজী ঈদগা মাঠ ও চিকারবাড়ি ঘাট এলাকায় নদীর তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে স্থানীয় আফাজ উদ্দিনের বাড়ির একাংশ এবং শত বছরের পুরোনো চিকারবাড়ি ঘাট বিলীন হয়েছে। দক্ষিণপাড়া ঈদগা মাঠের পাশ দিয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পূর্বদিকে চলে যাওয়ায় ১০ একরের বেশি কৃষিজমি নদীগর্ভে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, চলতি বছর প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কৃষিজমি, রাস্তা, ঈদগা মাঠসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন নদী খনন না হওয়ায় পলি জমেছে। এর মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ড্রেজার দিয়ে বিভিন্ন স্থানে গভীর গর্ত করে বালু উত্তোলন করায় নদীর গতিপথ বদলে গেছে।

স্থানীয় সুরুজ্জামান, আনিসুর রহমান, আব্দুর রহিম ও রফিকুল ইসলাম জানান, তাঁদের প্রায় পাঁচ একর কৃষিজমি নদীতে চলে গেছে। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে বাছুর আলগা দড়িপাড়া গ্রামটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

চিকারঘাট এলাকার কৃষক আসাদুল মিয়া বলেন, নদীভাঙনে তাঁরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। বসতভিটা ও কাজ হারিয়ে অনেক পরিবার চরম দুর্ভোগে রয়েছে। নদীতীরের মানুষের দুর্দশা দেখার কেউ নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

চরমধুয়া গ্রামেও ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ এলাকায় ধান, পাট, ভুট্টা ও সরিষার চাষ হয়। নদীভাঙনে অল্প সময়ের মধ্যে বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। কেউ অন্যত্র গিয়ে বসতি গড়েছেন, কেউ দিনমজুরের কাজ করছেন, আবার অনেকে ঢাকায় চলে গেছেন।

নদীভাঙনে চরমধুয়া গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের বেশির ভাগই বিলীন হয়েছে। কৃষিপণ্য এখন অনেক ক্ষেত্রে ঘোড়ার গাড়িতে করে পরিবহন করতে হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুর রশিদ, সাবেক নায়েব আব্দুল বারেক ও সাবেক ইউপি সদস্য চানু মিয়ার বসতভিটা ও চাষের জমিও নদীতে চলে গেছে।

চরমধুয়া নামাপাড়া গ্রামে তিন হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভাঙন ঠেকানো না গেলে গ্রামের কবরস্থান, কমিউনিটি ক্লিনিক, গুচ্ছগ্রাম, মসজিদ ও বিদ্যালয়ও ঝুঁকিতে পড়বে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে চরঅষ্টধার ইউনিয়নের নারায়ণখোলা, রেহাই অষ্টধার ও দক্ষিণ নারায়ণখোলা এলাকায় প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন চলছে। এরই মধ্যে দক্ষিণ নারায়ণখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীতে বিলীন হয়েছে। কয়েক বছরে এসব এলাকার বহু বসতঘর ও কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে গেছে।

নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মৃগী নদীর ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম জানান, নারায়ণখোলা-রেহাই অষ্টধার এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ ৫০০ মিটার অংশে অস্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চরমধুয়া এলাকায় ৮৫০ মিটার অংশের ভাঙন প্রতিরোধে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী বলেন, চরমধুয়া নামাপাড়া এলাকায় প্রায় সাড়ে ৮০০ মিটার অংশ অস্থায়ীভাবে মেরামতের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে। তবে নদীভাঙনের বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ভাঙন ঠেকানো কঠিন বলেও জানান তিনি।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com